চলচ্চিত্রের বিচারে বছরের সবচেয়ে প্রথিতযশা পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান
হিসেবে একক প্রাধান্য পেয়ে থাকে এই অস্কার, যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়
অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস।
১৯২৯ সাল থেকে শুরু করে ২০১৪ এ এসে সর্বমোট
অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ৮৬ বারের সমান আসর। অস্কার
নিয়ে ফান ফ্যাক্টস কিংবা মজার মজার ট্রিভিয়ার কোনো সীমা পরিসীমা নেই।
ইন্টারনেটে এই সংক্রান্ত আর্টিকেল-ফিচারও রয়েছে অজস্র। তাই গতানুগতিক ধারায়
না গিয়ে আসুন দুইটি ব্যাতিক্রমী দিক নিয়ে অস্কারের মজার মজার কিছু তথ্য
জেনে নেই,
আপনি কি জানেন, অস্কার ইতিহাসে এমন অনেক ক্যাটাগরী রয়েছে যেগুলোর
স্থায়িত্ব ছিলো মাত্র কয়েক বছরের জন্য? কালের গর্ভে সেইসব ক্যাটাগরি আর
ক্যাটাগরির বিজয়ীরা হয়ে গেছেন ইতিহাস, সময়ের পরিক্রমায় মানুষ তাদের ভুলেও
গেছে। আসুন জেনে নেই এমনই সব ক্যাটাগরি আর সেইসব বিজয়ীদের কথা,
১। বেস্ট ইন্জিনিয়ারিং ইফেক্টস: মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ক্যাটাগরিটি
শুধুমাত্র অস্কার ইতিহাসের প্রথম আসরেই প্রযোজ্য ছিলো। সেবছর এই
ক্যাটাগরিতে পুরষ্কার লাভ করে সেরা চলচ্চিত্রে পুরষ্কার পাওয়া “উইংস”
ছবিটি।
২। সেরা সহকারী পরিচালক: ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত অস্কারের আসরে
সেরা সহকারী পরিচালককে অস্কার খেতাবে ভূষিত করা হতো। এর পিছনে কারণ ছিলো,
তখনকার সময়ে একটি ভালো সিনেমাকে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে, পুরো প্রোডাকশান
স্টুডিওর একটা ভূমিকা থাকা অত্যাবশ্যক ছিলো। একজন সহকারী পরিচালকের আসল কাজ
ছিলো সিনেমার মেইন পরিচালক ও বাকি ক্রুদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। সেখান
থেকেই এই ক্যাটাগরির উৎপত্তি।
৩।১৯২৮ সালের সিনেমাগুলোকে নিয়ে আয়োজিত প্রথম অস্কারের আাসরের বিভিন্ন
ক্যাটাগরিই ছিলো পরীক্ষামূলক, যেগুলো বেশিদিন তো নয়ই, পরের বছরও চালু থাকে
নি। যেমন, বেস্ট টাইটেল রাইটিং কিংবা বেস্ট ইউনিক এন্ড আর্টিস্টিক কোয়ালিটি
অফ প্রোডাকশান।
৪। বেস্ট ড্যান্স ডিরেকশান নামের এই বিশেষ ক্যাটাগরির স্থায়িত্ব ছিলো
১৯৩৫ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত। তখনকার সময়ে “The Great Ziegfeld” এর হাত ধরে
হলিউডে চলছিলো মিউজিক্যাল বায়োগ্রাফীর জোয়ার। তবে ১৯৩৭ এর পর এই
ক্যাটাগরিটি স্থগিত হয়ে যায়, এবং পরবর্তীতে আর কখনো বিবেচিত হয়নি।
৫। বেস্ট স্টোরি: অস্কারের প্রথম আসর থেকে শুরু করে একেবারে ১৯৫৭ পর্যন্ত
স্থায়িত্ব ছিলো এই বিশেষ ক্যাটাগরীর।আসলে এখন যা “Best Original/Adapted
Screenplay” হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে, অতীতে তাই ছিলো এই বেস্ট স্টোরি
ক্যাটাগরিটি। এটি বাতিল হওয়ার পিছনে প্রভাব ফেলেছিলো, ১৯৪০ সাল থেকে
“Writing Original Screenplay” ক্যাটাগরির মাধ্যমে বছরের সেরা মৌলিক গল্পের
রচয়িতাকে অস্কার দেয়াটা। বেস্ট স্টোরি ক্যাটাগরির উল্লেখযোগ্য উদাহরণ
হচ্ছে, “Mr. Smith Goes to Washington”। এটি সর্বমোট ১১ টি বিভাগে অস্কার
মনোনয়ন পেলেও শুধুমাত্র বেস্ট স্টোরি ক্যাটাগরিতেই পুরষ্কার লাভ করে।
এইবার আসা যাক, বিভিন্ন অস্কার আসরে ঘটে যাওয়া বিশেষ কিছু মুহূর্তগুলোর ব্যাপারে যেগুলো মানুষকে শিহরিত করেছিলো, অনুপ্রাণীত করেছিলো।
১। ১৯৭৩ সালের অস্কারের আসরে সেই অ্যামেরিকান ইন্ডিয়ান মেয়েটার কথা কি
আপনাদের মনে আছে? সেবার সেরা অভিনেতা ক্যাটাগরিতে অস্কার পেয়েছিলেন মার্লন
ব্র্যান্ডো, গফফাদার সিনেমায় অনবদ্য অভিনয়ের জন্য। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানে
মার্লন ব্র্যান্ডোর অনুপস্থিতিতে পুরষ্কার নিতে স্টেজে উঠেন এক আমেরিকান
ইন্ডিয়ান মেয়ে। তিনি মার্লন ব্র্যান্ডোর হয়ে এই অস্কার পুরষ্কারটি নি্যে
অস্বীকৃতি জানান, যার পিছনে কারণ হিসেবে তুলে ধরেন, আমেরিকার ন্যাটিভ
ইন্ডিয়ানদের উপর আনফেয়ার ট্রিটমেন্টকে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, সেই
অস্কার পদকটি আসলে কোথায় আছে, কার কাছে আছে সেটির হদিশ এখনো বের করা যায়
নি।
২। সুপারম্যানখ্যাত ক্রিস্টোফার রিভসের হুইলচেয়ারে করে ১৯৯৬ এর অস্কার
আসরের সেই এন্ট্রান্সের কথা ভুলি কি করে? অস্কারের ইতিহাসে অতোটা শক্তিশালী
মুহূর্ত কবেই বা এসেছে? ঘোড়ায় চলাকালীন এক মারাত্মক দূর্ঘটনায় আহত হয়ে
প্যারাইলড হয়ে যান। কোনোমতে প্রাণে বেঁচে গেলেও অভিনয়জগত থেকে বিদায় নিতে
হয় তাকে, সর্বময় সংগী হয় হুইলচেয়ার। সেই হুইলচেয়ারে করে ৯৬ এর অস্কার আসরে
সবাইকে আবেগে উদ্বেলিত করে প্রেজেন্ট করতে স্টেজে আসেন রিভস। সবাই দাঁড়িয়ে ও
হাততালি দিয়ে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। অস্কার ইতিহাসে এটি খুবই
উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হয়ে সবসময়ই বিবেচিত হয়ে আসছে।
৩। কিংবদন্তী চার্লি চ্যাপলিন ১৯৭২ সালে যখন একাডেমি কর্তৃক সম্মাননা
পুরষ্কারে ভূষিত হন, সেটি ছিলো খুবই স্পেশাল একটি মুহূর্ত। গ্রেটেস্ট কমেডি
অ্যাক্টর এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র পরিচালক হয়েও কখনো অস্কার
পুরষ্কার না পাওয়া এই মানুষটি যখন সম্মাননা অস্কার নিতে স্টেজে উঠেন তখণ
উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে চার্লি চ্যাপলিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। শুধু
তাই নয়, দীর্ঘ ১২ মিনিট স্ট্যান্ডিং ওবেশানের সেই রেকর্ডটি এখনো টিকে আছে
অমলিন হয়ে।
৪। বিখ্যাত আমেরিকান পরিচালক মার্টিন স্করসেসি তার সুদীর্ঘ চলচ্চিত্র
জীবনে অনেকবারই অস্কার মনোনীত হলেও ভাগ্যদেবীর দেখা পান নি। তবে সবকিছুর
হিসেব পাল্টে দিয়ে ২০০৭ সালের অস্কার আসরে দ্যা ডিপার্টেড সিনেমাটির জন্য
সেরা পরিচালক হিসেবে পুরষ্কার জিতেন স্করসেসি। এবং সেই পুরষ্কারটি তিনি
গ্রহন করেন দীর্ঘদিনের বন্ধু Steven Spielberg, George Lucas আর Francis
Ford Coppola এর থেকে, যারা একসাথে সবাই ছিলেন ৭০ দশকের আমেরিকার সিনেমা
ইন্ডাস্ট্রির পিলারস্বরূপ।
৫। ১৯৩৯ সালে ডিজনির প্রথম অ্যানিমেটেড ফিচার Snow White and Seven Dwarfs
যখন মুক্তি পায়, মুক্তির পরপরই এটি সর্বমহলে সাড়া ফেলে এবং ব্যাপক প্রশংসিত
হয়। তখনকার সময় অস্কারে বেস্ট অ্যানিমেটেড ফিচার নামে কোনো ক্যাটাগরি না
থাকায়, একাডেমি সিদ্ধান্ত নেয় এটিকে বিশেষ কোনো পুরষ্কারে পুরষ্কৃত করার।
সেই পুরষ্কারটিও ছিলো বেশ মজার। তা ছিলো সিনেমার সাথে মিলিয়ে একটি বড়ো
অস্কার স্ট্যাচু আর সাথে ছোটো ছোটো সাতটি অস্কার স্ট্যাচু।
এগুলো ছাড়াও অস্কারের আসরে ঘটে যাওয়া অনেক মজার মজার ঘটনা রয়েছে সেগুলোর
লিস্ট করা শুরু করলে আর শেষ হবে না। উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে বরার্টো
বেনজিনির পুরষ্কার লাভের ঘোষণার সাথে সেই উন্মাদনা, কিংবা ম্যাট ডেমন আর
বেন অ্যাফ্লেকের অস্কারলাভের মুহূর্তটুকু কিংবা ১৯৯২ সালের অস্কার আসরে
বিলি ক্রিস্টালের হ্যানিবল লেক্টারকে অনুকরণ করে সেই বিশেষ এন্ট্রান্সটার
কথা বলতেই হয়। এছাড়া আরেকটি ঘটনার কথা না বললেই নয়, জোকার চরিত্রে হিথ
লেজার যখন অস্কার পেয়েছিলেন সেইসময় তার পরিবারের পক্ষ থেকে যেই ভাষণটি দেয়া
হয়েছিলো সেটি ছিলো খুবই আবেগঘন এবং স্পেশাল একটি মুহূর্ত।
লেখাটি শেষ করার আগে অস্কার বিষয়ক কিছু কমন ফ্যাক্টস:
১। পুরুষদের মধ্যে সর্বাধিক অস্কার পাওয়ার রেকর্ডটি ওয়াল্ট ডিজনির। তিনি
সর্বমোট ২৬ বার অস্কার লাভ করেন। আর নারীদের মধ্যে এই রেকর্ডটি এডিথ হেডের।
তিনি পেয়েছেন মোট ৮ বার।
২।বিট্রিস স্ট্রেইথ ১৯৭৭ সালে সিডনি লুমেটের পরিচালিত নেটওয়ার্ক ছুবিতে
অনবদ্য অভিনয় করে সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর পুরষ্কার লাভ করেন। তবে মজার
ব্যাপার হচ্ছে, এই সিনেমায় তার অভিনয়ের ব্যা্প্তি ছিলো মাত্র পাঁচ মিনিটেরও
কম। এছাড়া, প্যাটি ডিউক তার “The Miracle Worker” সিনেমার জন্য Best
Supporting Actress ক্যাটাগরিতে অস্কার লাভ করেন। গোটা মুভিতে তিনি
কেবলমাত্র একটি সংলাপই দেন, আর তা ছিলো “water”।
৩। ১৯৮৭ সালের অস্কারে সেরা পরিচালক ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পাওয়া পাঁচজন্য
ছিলেন নন আমেরিকান পরিচালক। এরা হলেন, Bernardo Bertolucci(Italy), John
Boorman(England), Lasse Hallström(Sweden), Norman Jewison(Canada), এবং
Adrian Lyne(England)৪। স্ক্রীণরাইটার ক্যাটাগরিতে সর্বাধিক মনোনয়নের
রেকর্ড উডি অ্যালেনের দখলে। মোট ১৬ বার মনোনয়ন পেয়ে এরমাঝে তিনবার অস্কার
নিজের ঝুলিতে পুরেছেন। আর জর্জ বার্নার্ড শ হলেন একমাত্র ব্যাক্তি যিনি
সাহিত্যে নোবেল এবং অস্কার দুইটিই নিজের দখলে রেখেছেন।
৫। অস্কার ইতিহাসে মাত্র তিনটি সিনেমাই আছে যেগুলো “big five Oscar awards”
খ্যাত ক্যাটাগরিতে অস্কার লাভ করেছে। সেই বিগ ফাইভ ক্যাটাগরিগুলো হলো,
Best Picture, Best Director, Best Actor, Best Actress আর Best
Original/Adapted Screenplay। এই পাঁচটি বিভাগেই জয়লাভকারী সিনেমাগুলো হলো,
It Happened One Night(1934), One Flew Over the Cuckoo’s Nest(1975) আর
The Silence of the Lambs(1991)।৬।অস্কারের আসরে সর্বাধিক ১১ বার মনোনয়ন
পেয়ে একটিতেও না জিতার রেকর্ড রয়েছে Turning Point(1977) আর The Color
Purple(1985) সিনেমার। এই বছর আমেরিকান হাসল ১০ টি বিভাগে নমিনেশান পেয়ে
একটিতেও জয়লাভ করেনি।
৭। উইলিয়াম ওয়াইলার হচ্ছেন সবচেয়ে বেশিবার অস্কার মনোনীত পরিচালক, তিনি
সর্বমোট ১১ বার মনোনয়ন পান, আর জন ফোর্ড হচ্ছেন সর্বাধিক অস্কারজয়ী
পরিচালক। তিনি মোট চারবার অস্কার লাভ করেন।