বিশ্ব ইতিহাস - History Of The World লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বিশ্ব ইতিহাস - History Of The World লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২৭ জুলাই, ২০১৬

'প্রথম বিশ্বযুদ্ধ'

'প্রথম বিশ্বযুদ্ধ'

'প্রথম বিশ্বযুদ্ধ'

First World war Ai Image

যেভাবে শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম এত অস্ত্র এবং রক্তের লড়াই ছিল 'প্রথম বিশ্বযুদ্ধ'। ১৯১৪ সালে যদি গ্যাভ্রিলো প্রন্সিপের অস্ত্রের মুখ থেকে গুলিটা না বের হত, তাহলে হয়ত মানবজাতিকে এত রক্তক্ষয়ী একটা যুদ্ধ দেখতে হত না। ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি'র সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনার মধ্য দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর মিত্রপক্ষের সাথে জার্মানীর যুদ্ধবিরোধী চুক্তি সাক্ষরের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরুর আছে একটা দীর্ঘ ইতিহাস।

কেনো শুরু হয়েছল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সেটা জানতে হলে আমাদেরকে আরো ৪০ বছর পিছনে যেতে হবে। আমি খুব সহজ ভাষায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর গল্পটা তুলে ধরার চেষ্টা করব। ১৮৭০ আধুনিক জার্মানের প্রতিষ্ঠাতা বিসমার্কের (Prince Otto von Bosmark) এর নেতৃত্বে জার্মানি আর ইটালীর একত্রীকরণের কাজ সম্পূর্ন হয়। একই সাথে ইউরোপে দুই দুইটা বড় শক্তির আত্মপ্রকাশের ফলে ইউরোপের শক্তিসাম্য বা Balance of Power এর বিরাট পরিবর্তিন ঘটে। এই সময়টায় ইউরোপের দেশগুলো আফ্রিকা মহাদেশ এবং মধ্য এশিয়ায় সাম্রাজ্য বিস্তারে বেশ আগ্রহী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল। ইউরোপের দেশগুলো মূলত আফ্রিকাতেই তাদের রাজ্য বিস্তারে বেশি আগ্রহী ছিল কারণ আফ্রিকায় প্রচুর কাঁচামাল পাওয়া যায়। পূর্ব এশিয়ার জাপানও রাজ্য বিস্তারে বেশ তৎপর ছিল।

জার্মানীর একত্রীকরণের শেষ পর্যায়ে বিসমার্ক Franco-Prussian War (ফ্রাঙ্ক-প্রুশিয়ান যুদ্ধ) এ ফ্রান্সের পরাজয়ের সুযোগে আলসেস (Alsace) ও লরেন (Lorraine) প্রদেশ দুটো জার্মান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করেন। এর ফলে ফ্রান্স আর জার্মানির চিরশত্রুতা নতুন করে বৃদ্ধি পায়। সেই সাথে জার্মানির কবল থেকে হারানো প্রদেশ দুটো পুনরুদ্ধারের জন্য ফ্রান্স সুযোগ খুঁজতে থাকে। কিন্তু চতুর বিসমার্ক তো সে সুযোগ দেন ই নি বরং যাতে কূটনৈতিকভাবে এবং ইউরোপিয়ো রাজনীতি থেকে ফ্রান্সকে বিচ্ছিন্ন করা যায়, সে সুযোগ খুঁজতে থাকেন। এজন্য প্রথমে তিনি ১৮৭৯ তিনি জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির মধ্যে দ্বৈত মৈত্রীচুক্তি (Duel Alliance) করেন। এরপর ১৮৮১ সালে জার্মান সম্রাট কাইজার, অস্ট্রিয়ার সম্রাট (যিনি হাঙ্গেরির সম্রাট হিসেবেও পরিচিত) এবং রাশান সম্রাট জার এর মধ্যে তিন সম্রাটের মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করেন। যেটা League of Three Emperor's নামে পরিচিত। এরপর ইটালির সাথে বিসমার্কের ভাল সম্পর্ক থাকার দরুন তিনি ১৮৮২ সালে দ্বৈত মৈত্রীচুক্তিতে ইটালিকেও অন্তর্ভূক্ত করেন। এদিকে আবার আগে থেকেই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এবং রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্কটা খারাপ। আবার রাশিয়া এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি দুই সাম্রাজ্যেরই রাজার দ্বারা পরিচালিত একনায়কতন্ত্র। তাই জার্মানি - ইটালি - অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির এক হওয়াটা রাশিয়া যাতে মনে না করে যে এটা তাদের বিরুদ্ধে এজন্য বিসমার্ক রাশিয়ার সাথে ১৮৮৭ সালে পুননিশ্চিত চুক্তি বা Reinsurance Treaty সম্পাদন করেন। মূলত এটা ছিল লোক দেখানো। কিন্তু এরমধ্য দিয়ে ইউরোপীয় রাজনীতি থেকে ফ্রান্স ছিটকে পড়ে। কিন্তু কথায় আছে রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। বিপত্তিটা ঘটল যখন ১৮৮৮ সালে সম্রাট দ্বিতীয় উইলিয়াম (William II) জার্মানির নতুন কাইজার হন। যিনি বিশ্বরাজনীতির (Weltpolitik) প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত। এই নতুন কাইজারের সময় ফ্রান্স তার বেড়াজাল থেকে বের হওয়ার সুযোগ পায়। এই নতুন কাইজার ছিলেন উচ্চাভিলাষী। তিনি বহির্বিশ্বে জার্মান উপনিবেশ স্থাপন এবং বিশেষত বলকান উপদ্বীপে সম্প্রসারণবাদী নীতির উপর জোর দেন। বিসমার্ক এতে বাঁধা দেন। ফলে কাইজার ১৮৯০ সনে বিসমার্ককে চ্যান্সেলরের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন। এর ফলে বিগত বছরগুলোতে আনা বিসমার্কের সকল চুক্তি ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়ে। ফলে সুবিধাটা হল ফ্রান্সের। ফ্রান্স তার বিচ্ছিন্ন অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে ১৮৯৪ সালে রাশিয়ার সাথে আঁতাত (Entente) গড়ে তোলে।

এতদিন ব্রিটেন ইউরোপীয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে ছিল এবং দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছিল। ইতোমধ্যে ১৮৯৭ সালে জার্মানি নতুন আইন করে ব্রিটেনের সাথে উপনিবেশিক প্রতিযোগিতার জন্য জার্মানি বিরাট নৌবহর তৈরি করা শুরু করে। যেটা অ্যাডমিরাল তিরপিজ'স ল (Admiral Tirpitz's Law) নামে পরিচিত ছিল। এর ফলে নড়েচড়ে বসে ব্রিটেন। জলপথে তাদের আধিপত্য হুমকীর সম্মুখীন হয়। ফলে ব্রিটেন ইউরোপীয় রাজনীতিতে পুনরায় ফিরে আসার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এবং ১৯০৪ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ দিপাক্ষিক চুক্তি (Entente Cordiale) সম্পাদিত হয়। ১৯০২ সালে ব্রিটেন আর জাপান মৈত্রীচুক্তি করে। ১৯০৪-০৫ সালে রুশ-জাপানীজ যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে তৎকালীন সাম্রাজ্যবাদী জাপান সাম্রাজ্যের কাছে রাশিয়ার পরাজয় ঘটে। যুদ্ধ পরাজয়ের হলে রাশিয়া একদম একাকি হয়ে পড়ে। তখন তারা একরকম বন্ধুহীন অবস্থা পার করছিল। তারা ইউরোপের দেশগুলোর সাথে মৈত্রীতে আসার সুযোগ খুঁজতে থাকে। এরমধ্যে ১৯০৫-০৬ সালে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে "মরক্কো সমস্যা (The Moroccan Crisis)।

 ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মধ্যে যে নতুন Entente Cirdiale বা আঁতাত হয়েছে সেটা পরীক্ষা করার জন্য জার্মানি একটা কূটনৈতিক চাল চালার চেষ্টা করে। জার্মানি মরক্কো'র স্বাধীনতা বা অধীনতার প্রশ্নে মরক্কোর সুলতানকে তাদের স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য সব রকম সাহায্য করার কথা ঘোষনা দেয়। আফ্রিকার একমাত্র এই দেশটাই তখন কোন ইউরোপিয়ান দেশের অধীনে ছিল না এবং সেই সময় ফ্রান্স মরক্কো দখলের পঁয়তারা করছিল এবং ইজিপ্ট বা মিশর ব্রিটিশদের অধীনে ছিল। এর জন্য জার্মানি মরক্কোর ভবিষ্যতের জন্য একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের দাবী করে যেটা দুবছর পর ১৯০৬ সালে স্পেনের আলজিসিরাস এ অনুষ্ঠিত হয়। জার্মানি দেখতে চাচ্ছিলো এতে ফ্রান্স আর বৃটেনের প্রতিক্রিয়া কি হয়! কিন্তু জার্মানি এ পরীক্ষায় হেরে যায়। তাছাড়া জার্মানি ফ্রান্স আর ব্রিটেনের চুক্তি বিশ্বাস করত না কারণ তারা জানত অ্যাংলো-ফ্রান্স সম্পর্কের একটা বৃহৎ ইতিহাস আসে। এটা জার্মানীর একটা বড় পরাজয় ছিল যার ফলে ফ্রান্স-ব্রিটেন তাদের মৈত্রীচুক্তিকে সামরিক রূপ দিতে বাধ্য হয়। এ পর্যন্ত ইউরোপীয় রাজনীতিতে একটি বড় শক্তি গড়ে ওঠে। সেটি হচ্ছে: - জার্মানি - অস্ট্রিয়া - হাঙ্গেরি - ইটালি ফ্রান্স- ব্রিটেন এ পর্যন্ত বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি যদিও দুই দেশের অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত। বড় হগে ওঠেনি কারণ ব্রিটেন ছিল ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে। আর জার্মানি, ইটালি এবং অস্ট্রিয়া - হাঙ্গেরি ছিল ফ্রান্সের তিন দিকে ঘেরা। সুতরাং ইউরোপের অন্য তিন দিকে তখনো ফ্রান্সের বন্ধু কেউ ছিল না। আর ফ্রান্সকে আগেই জার্মানি ইউরোপের মূল রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। এ পর্যন্ত আমরা ১৯০৬ সালে মরক্কো সমস্যা পর্যন্ত আলোচনা করেছি এবং তিন বৃহৎ মিত্রশক্তি দেখেছি। যারা হচ্ছে যথাক্রমে জার্মানি, ইটালি এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি। বিশ্বযুদ্ধ শুরুর কয়েকটি পয়েন্ট যদি দাঁড় করাই তাহলে পাই, ১. ব্রিটেন আর জার্মানির মধ্যে নৌযান প্রতিযোগিতা।

কারণ ১৯০৬ সালে ব্রিটেন তাদের প্রথম 'ড্রেডনাউট (Dreadnought)' ব্যাটলশিপ তৈরি করে। আর জার্মানিও ততোদিনে বেশ উন্নতি করেছে ১৮৯৭ সালের 'Tirpitz's Navy Law' এর আওতায়। ২. ১৮৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে ফ্রান্স জার্মানদের কাছে আলসেস আর লোরিন হারানো ৩. ১৯০৭ সালে ব্রিটেন আর রাশিয়া মৈত্রীচুক্তি করে। এরমধ্যে দিয়ে ব্রিটেন, রাশিয়া এবং ফ্রান্স মৈত্রীচুক্তির আওতায় পরে এবং জার্মানী এটাকে তাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত বলে অভিযুক্ত করে। ৪. বসনিয়ান সমস্যার পর অস্ট্রিয়া বসনিয়া তাদের দখলে নিলে রাশিয়া বলকান দেশগুলোতে অস্ট্রিয়ার উপস্থিতিতে ভীয় হয়ে পড়ে। ৫. সার্বিয়ান জাতীয়তা। এটাই সবচেয়ে বড় কারণ ছিল। সার্বরা সবসময় সার্বভৌমত্ব চেয়ে এসেছে। হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্যের অধিনে থাকা যুগোস্লাভিয়া অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির দখলে ছিল। যেখানে বহু সার্ব আর ক্রোট রা থাকত এবং সার্বিয়া সবসময় তাদের এক করতে চেয়েছিলো। আর এই হার্বসবার্গ সাম্রাজ্যে বহু জাতীয়তার মানুষ ছিল যেমন, জার্মান, চেক, স্লোভাক, পোলিশ, রোমানিয়ান, স্লোভেন, হাঙ্গেরিয়ান, সার্ব, ক্রোট। এর মধ্যে থেকে যদি সার্ব এবং ক্রোটরা বের হয়ে যায় তবে অন্যান্য জাতিগুলোও আলাদা হতে চাইবে ফলে ভেঙ্গে যেতে পারে হ্যাবসাবার্গ সাম্রাজ্য। এজন্য অস্ট্রিয়া একটা "প্রতিরোধক যুদ্ধ (Preventive War)" চেয়েছিল যাতে সার্বিয়ার আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারে এবং যাতে সার্বিয়া বড় কোন শক্তি হয়ে উঠতে না পারে। এই কারণগুলো ছিল বিশ্বযুদ্ধ শুরুর কিছু প্রত্যক্ষ কারণ। আরো কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ আছে। এক এক করে আলোচনা করছি। ইয়োমধ্যে মরক্কো সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি। এরপর আসি ১৯০৭ সালে। ১৯০৭ সালে ব্রিটেন আর রাশিয়ার মাঝে মৈত্রীচুক্তি হয়। জার্মানদের কাছে যেটা একটা বড় পরাজয় ছিল। ১৮৯৪ সালে রাশিয়া আর ফ্রান্স চুক্তি করে আর ফ্রান্স হচ্ছে ১৯০৪ সালের করা ফ্রান্স-ব্রিটেনের "Entente Cordiale" চুক্তি করা ব্রিটেনের সহযোগী। এর আগে ব্রিটেন রাশিয়াকে তাদের একটা বড় হুমকি মনে করত ভারতবর্ষে ব্রিটেন সাম্রাজ্যের কারণে। কিন্তু ইতোমধ্যে অবস্থা পাল্টেছে। ১৯০৪-০৫ সালের রাশিয়া-জাপান যুদ্ধে রাশিয়ার হারার ফলে তাদের শক্তি অনেক কমে যায় এবং ব্রিটেন বুঝতে পারে রাশিয়ার সক্ষমতা। আর রাশিয়া খুঁজছিলো এক দীর্ঘসময়ের বন্ধু। এছাড়া শিল্পবিপ্লবের ফলে রাশিয়াতে নতুন যন্ত্রাংশ ব্যবহারে যে জটিলতা ছিল তা অনেকাংশে শিথিল হয়ে পরে। এবং রাশিয়া ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লবের দিকে আগ্রহী হয়ে পড়ে। এই চুক্তির ফলে রাশিয়া এবং ব্রিটেনের মাঝে যে দূরত্বগুলো ছিল সেগুলো অনেকাংশে দূর হয়। এটা কোন সামরিক চুক্তি ছিল না। কিন্তু এ চুক্তির ফলে ফ্রান্স, রাশিয়া আর ব্রিটেন যে মৈত্রীতে আবদ্ধ হয় জার্মানী সেটাকে তাদের বিরুদ্ধে গঠিত শক্তি হিসেবে মনে করে। এরপর ১৯০৮ সালে হয় 'বসনিয়া সমস্যা'। এটা একটা বড় সমস্যার সৃষ্টি করেছিল।

বসনিয়ায় ছিল তুরস্কের বর্ধিতাংশে দেখা দেয় বিপ্লব। এর সুযোগ নেয় অস্ট্রিয়া। তারা দখল করে বসনিয়া। এদিকে অন্যদেরও বসনিয়া নিয়ে আগ্রহ ছিল ব্যাপক। বসনিয়া সার্বিয়ার পাশের রাষ্ট্র। বসনিয়া নিয়ে সার্বিয়ারও আগ্রহ ছিল চূড়ান্ত কারণ বসনিয়ায় ৩০ লক্ষের মত সার্বরা থাকত যার মধ্যে সার্ব ছাড়াও ছিল ক্রোট এবং মুসলিম। সার্বিয়া তাদের ঘনিষ্ঠ সার্বদের কাছে সাহায্য চায়। রাশিয়া বিশ্বব্যাপী একটা সম্মেলন ডেকে ব্রিটেন আর ফ্রান্সের সমর্থন চায়। কিন্তু ব্যাপারটা পাল্টে গেল অন্যভাবে যখন সবাই দেখলো যদি এখানে যুদ্ধ শুরু হয় তবে জার্মানি অস্ট্রিয়াকে সবরকম সামরিক সহযোগিতা দিবে। ফ্রান্স বলকান অঞ্চলে কোন যুদ্ধে জড়িত হওয়ায় আগ্রহি ছিল না। ব্রিটেন তাদের আভিজাত্য থেকে কখনোই চাইত না জার্মানদের সাথে যুদ্ধে যেতে। আর জাপানের কাছে যুদ্ধে হারার পর রাশিয়া তখনো চুপচাপ। আরেকটা যুদ্ধের জন্য তারা ঝুঁকি নিতে আগ্রহী ছিল না। ফলে সার্বিয়া সাহায্যের জন্য কাউকেই সাথে পেল না। কোন আন্তর্জাতিক সম্মেলনও হল না। অস্ট্রিয়া বসনিয়াকে তাদের দখলেই রাখলো। জার্মানি-অস্ট্রিয়া সম্পর্কের এটা প্রথম বড় কোন অগ্রগতি ছিল। কিন্তু এর ফলে দুইটা বড় সমস্যা দেখা দেয়: ১. সার্বিয়া আবারো অস্ট্রিয়ার নিচে পড়ে থাকে এবং সার্বদের ভেতরে ক্ষোভ বাড়তেই থাকে। ২. রাশিয়া তাদের অসহায় অবস্থা থেকে সরে আসে এবং বড় একটা সামরিক বাহিনী গঠন শুরু করে। যাতে এরপর সার্বিয়া যদি আবার কোন সাহায্য চায় তবে তারা যেন সাহায্য করতে পারে। আগাদির সমস্যা, ১৯১১ সাল এটা ছিল মরক্কো সমস্যারই একটা পরিবর্তিত রূপ। ফ্রান্সের ট্রুপস মরক্কোর রাজধানী 'ফেজ' দখল করে যাতে সুলতানের বিরুদ্ধে একটা বিদ্রোহ করা যায়। ফ্রান্স মরক্কোকে তাদের বর্ধিতাংশ বানাতে চেয়েছিল। অন্যদিকে জার্মানি তাদের সশস্ত্র জাহাজ 'প্যানথার' মরক্কোর 'পোর্ট অফ আগাদির' এ প্রেরণ করে। তারা আশা করছিল যে তারা ফ্রান্সের উপর চাপ দিয়ে মরক্কো'র পালটা দখল নিবে, সেই সাথে ফরাসি কঙ্গোও দখলে আনবে। আগাদির জার্মানদের দখলে যাওয়ায় ব্রিটেন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে কারণ এতে তাদের ট্রেড রুট হুমকির মুখে দাঁড়ায়। এর প্রেক্ষিতে ব্রিটেনের Chancellor of Exchequer, লয়েড জর্জ একটি ভাষণ দেন, যেখানে তিনি জার্মানিকে সতর্ক করে বলেন যে, যেখানে ব্রিটেনের সার্থে আঘাত করা হবে সেখানে ব্রিটেন দাঁড়িয়ে থাকবে না বরং সামনে বাড়বে।

 এদিকে ফ্রান্সও তাদের অবস্থানে অনড় ছিল। শেষ পর্যন্ত জার্মানি আগাদির থেকে তাদের গানবোট সরায়। এটা অক্ষশক্তির একটা বড় জিয় ছিল। এরপর প্রথম ও দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধ ১৯১২-১৯১৩ যুদ্ধটা শুরু হয় যখন সার্বিয়া, গ্রিস, মন্টিনেগ্রো এবং বুলগেরিয়া (যারা 'বলকান লীগ' হিসেবে পরিচিত ছিল), তুরস্কে আঘাত করে। জলদিই জার্মান সরকার এবং ব্রিটেন ফরেইন সেক্রেটারি স্যার এডওয়ার্ড গ্রে লণ্ডনে একটি শান্তি সম্মেলনের আয়োজন করেন যেটা শেষ হয় তুরস্ককে বলকান লীগের দেশগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেয়ার মাধ্যমে। কিন্তু এ নিয়ে সার্বিয়া খুশি ছিল না। তারা আলবেনিয়া চেয়ে বসে যাতে তারা সহজেই সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু অস্ট্রিয়া জার্মান এবং ব্রিটেনের সহযোগিতায় ঘোষনা করে যে আলবেনিয়া একটা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই থাকবে। সার্বিয়াকে শক্তিশালি হওয়া থেকে বিরত রাখাতে এটা অস্ট্রিয়ার আরেকটি জয় ছিল। এরপর দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধ শুরু হয় যখন বুলগেরিয়া তাদের প্রাপ্তি নিয়ে অখুশি হয় এবং মেসিডোনিয়াকে চেয়ে বসে। বুলগেরিয়া সার্বিয়াকে অ্যাটাক করে কারণ এর বেশিরভাগ অঞ্চল সার্বিয়ার ভাগ্যে পরে। কিন্তু বুলগেরিয়ার পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয় যখন গ্রিস, তুরস্ক, এবং রোমানিয়া সার্বিয়াকে সহযোগিতা দেয়। বুলগেরিয়া পরাজিত হয় 'বুখারেস্ট চুক্তি ১৯১৩' দ্বারা যেটাতে বুলগেরিয়া প্রথম যুদ্ধ থেকে তারা যা পেয়েছিল তাই হারায়। কিন্তু এখানে দু'টো সমস্যা দেখা দেয়। ১. অস্ট্রয়া সার্বিয়ার এ জয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। ২. অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির মাঝে বসবাসরত সার্ব এবং ক্রোটরা হুমকির মুখে পড়ে যায়। ইতোমধ্যে সার্বিয়া এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির দ্বন্দ্ব এবং অন্যদিকে ব্রিটেন-ফ্রান্সের সাথে জার্মানির বিভেদ চরমে পৌছে গেছে। বিশ্ব তখন যুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত। শুধু একটি উপলক্ষ বাকি। এই উপলক্ষটুকুও শিঘ্রই এসে গেল। ১৯১৪ সালের ২৮ জুন। বসনিয়া ভ্রমণকালে বসনিয়া'র রাজধানী সারজেভোতে "গার্ভিলো প্রিন্সিপ" নামে একজন অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক "ফ্রাঞ্জ ফার্ডিন্যান্ড" এবং তার স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করে। পরে সে স্বীকার করে সে একজন সার্ব। অস্ট্রিয়া এতে সার্বিয়াকে দোষী বলে দাবি করে এবং সার্বিয়ান সরকারকে আল্টিমেটাম দেয়। সার্বিয়ান সরকার অস্ট্রিয়ার রিপোর্টের বেশিরিভাগ পয়েন্টই স্বীকার করেছিল। কিন্তু জার্মানির সমর্থনে অস্ট্রিয়া এই ঘটনাটিকে যুদ্ধ শুরুর কারণ হিসেবে চালাতে চেয়েছিল। অবশেষে ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে। অস্ট্রিয়া আবার সার্বিয়ার উপর চরাও হওয়াতে এবার রাশিয়া সার্বিয়ার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাদের সৈন্য সাজাতে নির্দেশ দেয় সেনাবাহিনীকে। জার্মানি এটা বন্ধ করতে বলে কিন্তু রাশিয়া তা উপেক্ষা করে। ফলে ১ আগস্ট রাশিয়া এবং ৩ আগস্ট ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

 যখন জার্মান সৈন্যরা ফ্রান্স অ্যাটাক করার জন্য বেলজিয়ামের পথকে বেছে নেয় তখন ব্রিটেনও নড়েচড়ে বসে। কারণ ১৮৩৯ সালে বেলজিয়ামের সাথে চুক্তি অনুযায়ি বেলজিয়ানকে নিরপেক্ষ রাখতে ব্রিটেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল। কিন্তু জার্মানি ব্রিটেনের নিষেধ অমান্য করায় ব্রিটেন ৪ আগস্ট যুদ্ধে প্রবেশ করে। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এবার ৬ আগস্ট রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে। অন্যান্য দেশগুলো আরো পরে যুদ্ধে যোগ দেয়। "মনরো মতবাদ" অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধ থেকে বিরত ছিল। অন্য মহাদেশে যুদ্ধের ব্যাপারে তারা আগ্রহী ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র অক্ষশক্তি সাথে যুদ্ধে যোভ দেয়। মানবজাতির ইতিহাসে এ যুদ্ধের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। এটা ছিল মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। অথচ যুদ্ধের পিছনে কারণটা আর কিছুই ছিল না। ছিল শুধু ক্ষমতার লোভ। "মনরো মতবাদ" এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে এরপরের কোন লেখায় আলোচনা করব। আজ এ পর্যন্তই শেষ করলাম।

বিবলিওগ্রাফি:
১. International Relations between two world 1919-1939 war by E.H. Carr ২. Mastering Modern World History by Norman Lowe ৩. History of International Relations by Abdul Halim এবং উইকিপিডিয়া।

সোমবার, ২১ জুলাই, ২০১৪

দাড়িওয়ালা সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলা

দাড়িওয়ালা সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলা


                                             
সিডোনিয়া (SIDONIA DE BARCSY) -দাড়িওয়ালা সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলা তাকে “The beard baroness’’ নামে ডাকা হয়।

অনেক দাড়িওয়ালা মহিলার তুলনায় তিনি ব্যতিক্রম ছিলেন কারণ তিনি ছিলেন একজন রয়েল ফ্যামিলির সদস্য। তিনি স্বাভাবিক ভাবেই জন্মগ্রহন করেন ১ই মে, ১৮৮৬ সালে। তার মুখে দাড়ি গজানো শুরু হয় তার প্রথম সন্তানের জন্মের পর ১৯ বছর বয়সে। দাড়ি গজানো শুরু হউয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সিডোনিয়ার দাড়ির দৈর্ঘ্য বেড়ে দাঁড়ায় ৯ইঞ্চিতে!! তার সন্তান টি (nicu) ছিলো জন্মগতভাবেই বামন...

অস্বাভাবিক লাগলেও সত্য সিডোনিয়ার হাসবেন্ড, (বেরন) Baron Antonio De barcsy তার স্ত্রীর দাড়ি নিয়ে গর্ববোধ করতেন এবং তিনি নিজেও ছিলেন অস্বাভাবিক রকম মোটা, ওজন ছিলো প্রায় ৪০০পাউন্ড এর মত, বেরন তার পরিবারের এসব অস্বাভাবিকতা কে ঠিক ই কাজে লাগান।
তারা ফ্যামিলির মেম্বার রা মিলেই একটি দল গঠন করেন, এবং প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। যেটি খুব শিগ্রই জনপ্রিয়তা অর্জন করে... তাদের জনপ্রিয়তার মুল কারণ ছিলো তারা সবাই ছিলো সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ। তারা বিভিন্ন দেশে ভ্রমন ও করেন এবং যথারীতি তাদের জনপ্রিয়তা বারতেই থাকে।

১৯১২ সালে বেরন মারা যান অসুস্থতা জনিত কারণে, স্বামী মারা যাওয়ার পর ও সিডোনিয়া তাদের দলটি চালু রাখেন এবং অনেক দেশে ভ্রমণ ও পরিচালনা করেন... সিডোনিয়া
মারা যান ১৯২৫ সালে ডায়াবেটিস এর কারণে। তাদের বামন সন্তান এবং বেরন বংশের শেষ উত্তরসূরি nicu মারা যান ১৯৭৬ সালে ৯১ বছর বয়সে।

                                                                    





  পৃথিবীর সবচাইতে ব্যয়বহুল ১০ টি মিলিটারী যুদ্ধ বিমান

পৃথিবীর সবচাইতে ব্যয়বহুল ১০ টি মিলিটারী যুদ্ধ বিমান

            

 

 পৃথিবীর সবচাইতে ব্যয়বহুল ১০ টি মিলিটারী যুদ্ধ বিমান

এফ/এ - ১৮ হর্নেট : $৯৪ মিলিয়ন


ইউএস আর্মির সর্বপ্রথম স্ট্রাইক ফাইটার বিমান। টুইন ইজ্ঞেনর এই যুদ্ধ বিমানটি সার্ভিস শুরু করে ১৯৮০ সনে। গ্রাউন্ড এবং এ্যারিয়াল উভং টার্গেটে এ্যাটাক করতে সক্ষম। বর্তমানে এটি ইউএস আর্মি ছাড়াও কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড, কুয়েত, মালয়েশিয়া, স্পেন এবং সুইজারল্যান্ড আর্মিতে ও সার্ভ করে যাচ্ছে।

EA-১৮G Growler: $102 মিলিয়ন

ea18g_growler.jpg
এটি মূলত এফ/এ - ১৮ হর্নেট ফাইটারের একটি লাইট আর্ম ভার্সন যা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এর জন্যে ডেভলাপ করা (মূলত এখন NAVY তে সার্ভ করে যাচ্ছে)। এটি এ্যান্টি এ্যায়ারক্রাফ্ট রাডার অবজেক্ট কে খুজে বের করে এবং শত্রু পক্ষের কমিউনিকেশান সিস্টেমে নিজের পাঠানো সিগন্যালের মাধ্যমে পুরো জ্যাম করে দিতে সক্ষম।

V-22 অস্প্রে : $118 মিলিয়ন

v22_osprey.jpg

২০০৭ সনের ইরাক যুদ্ধে প্রথম ব্যবহার করা হয়। টিল্ট রোটরের এই যুদ্ধাবিমান হেলিকপ্টাররে মত উঠা নামা করলেও এটি একটি ফিক্সড উইং প্লেনের চাইতে দ্রুত উড়ে থাকে। ভয়াবহ এই বিমানের ইতিহাস আরেকটু ঘাটলেই যানতে পারবেন এর ধ্বংসযজ্ঞের আরো তথ্য।

এফ-৩৫ লাইটিং  II : $১২২ মিলিয়ন

f35_lightning2.jpg
ইউএস মিলিটারির এ যাবৎ কালের সবচেয়ে বড় ডিল সই হয় এই সুপারসনিক ফাইটারের প্রজেক্ট শুরু হওয়ার কালে ২০০১ সনে। যদিও বর্তমানে এক্সপার্টরা মনে করছেন এই বিমান তাদের আশা পূরণ করতে পারেনি। তাদের মতে এটি খুবই লাইট এবং আন্ডারআর্মড। ২০০৭ এবং ২০০৮ সনে কম্পিউটার হ্যাকার দ্বারা ৭.৫ মিলিয়ন কোডের তথ্য পাচার কালীন সময়ে এই বিমানের তথ্যও পাচার হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। তাই কোন শত্রু পক্ষের স্কোয়াডে এই বিমানের দেখতে পেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

E 2D - এ্যাডভান্সড হকআই : $২৩২ মিলিয়ন

e2d_hawkeye.jpg
এর পাওয়ারফুল এবং এ্যাডভান্সড রাডার সিস্টেম এর টেরিটরির ৩০০% এলাকা আরো বেশি কভার করবে। এটি এখনও আন্ডার ডেভেলাপমেন্ট অবস্থায় আছে। যদিও এর দুটি টেস্ট ভার্সন নেভি কে সাপ্লাই করা হয়েছে। এবং তারা ও এতে পজিটিভ ফিডব্যাক দিয়েছে।

VH-৭১ Kestrel :  $২৪১ মিলিয়ন

vh71_kestrel.jpg
এই হাইটেক হেলিকপ্টার প্রজেক্ট ইতোমধ্যে President's aging chopper fleet এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এটি বারাক ওবামার অফিস থেকে বাড়ী ফেরার যান হতে চলেছে। তবে গত 22 জুলাই এই বাজেট $৪৮৫ মিলিয়নে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

পি - ৮ এ Poseidon : $২৯০ মিলিয়ন

p8a_poseidon.jpg
এর ৭৮৭ জেট এর মিলিটারি ভার্সনটি নভি কে ব্যবহার করতে দেয়া হবে যা ব্যবহার হবে মূলত সাবমেরিন ওয়ারফেয়্যার এবং ইন্টেলিজেন্স গ্যাদারিং এর জন্যে। তবে পুরোপুরি সার্ভিস শুরু করতে এটি ২০১৩ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে ডেভেলপাররা বলছেন।

C17A গ্লোবমাষ্টার III : $৩২৮ মিলিয়ন

c17a_globemaster3.jpg
এয়ারফোর্সের মিলিটারি ট্রান্সপোর্ট প্লেনটি মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে মেডিকেল সার্ভিস দিয়ে থাকে এবং এয়ারড্রপ মিশনের সাথে যুক্ত। বর্তমানে ১৯০টি C17A গ্লোবমাষ্টার III সার্ভিসে রানিং অবস্থায় আছে। ১৯৯৩ সন থেকে নিরলস ভাবে সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে।  ১০২ জন প্যারাট্রুপার একসাথে ডাইভ দিয়ে থাকে এই বিমান থেকে। ইরাক এবং আফগান যুদ্ধেও ব্যবহার করা হয়েছে এই বিমান।

F-22 Raptor : $৩৫০ মিলিয়ন

f22_raptor.jpg
বিশ্বের সবচাইতে বেষ্ট কমব্যাট প্লেন হিসেবে বিবেচনা করা হয় এই এফ - ২২ রাপ্টারকে। এর মানুফ্যাকচারিং ডিজাইনার হচ্ছেন Lockheed Martin। শত্রু পক্ষের নিক্ষেপ করা ক্রুজ মিসাইল কে শুট ডাউন করার মত ভয়াবহ কাজ ছাড়াও আছে সুপারসনিক স্পীড। বর্তমানে সিনেট বড় ডিবেট চলছে যে এর আরো সাতটি বানানো হবে কি না তা নিয়ে। যার টেটাল খরচ পরবে $১.৬৭ বিলিয়ন এবং এই প্রোজেক্টে কাজ করবে ২৫০০০ এর ও বেশী আমেরিকান।

B-2 Spirit : $২.৪ বিলিয়ন

b2_spirit.jpg
আপনারা হয়ত আমার কথা বিশ্বাস করবেন না, তারপরেও পরেও বলি। ছোটবেলায় আমার এটি পছন্দের গেমস ছিল "Aero fighter 2"। জানিনা আপনাদের কেউ খেলেছেন কিনা। খেলে থাকলে নিশ্চই মনে করতে পারবেন যে এ্যারো ফাইটারের একটি বস ছিল হুবুহু এই বি - ২ স্পিরিট। আমি নিজেও প্রথমে দেখে অবাক হয়েছি। এটি বোমারু বিমান যার বর্তমানে ২০টি ইউএস আর্মির সার্ভিসে আছে। ইনফ্রারেড, এ্যাকুইস্টেক এবং ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রাডার ভিসিউয়াল সিগন্যালেও একে খুজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। আফগান এবং ইরাক যুদ্ধে সমানে বোমা ফেলা হয় এই বিমান দিয়ে।


যুদ্ধবিমানের ইতিহাসে সেরা বিমানগুলো

প্রতিটি প্রতিটি দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বিমান বাহিনীর গুরুত্ত অপরিসীম। শত্রু দেশের বিমান  আক্রমন মোকাবেলা এবং  প্রতি আক্রমনের মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকল্পে প্রতিটি দেশের নিজস্ব বিমান বাহিনী থাকা আবশ্যক।আজকের পোস্ট এ যুদ্ধবিমানের ইতিহাসে কয়েকটি আইকন বিমান নিয়ে আলোচনা করব।



MIG-21


মিগ ২১ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি ষাটের দশকের একটি যুগপৎ যুদ্ধবিমান। এটি পৃথিবীর সর্বাধিক উৎপাদিত এবং বিক্রিত বিমান গুলোর একটি। মিকোয়ান গুরেভিচ কোম্পানির নকশাকৃত এই বিমান এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর বহু দেশ ব্যবহার করে। এর ন্যাটো কোডনেম ছিল Fishbed। মিগ২১ একটি সুপারসনিক জেট ফাইটার। এটি আকাশ থেকে মাটিতে এবং আকাশ থেকে আকাশে শত্রু বিমানের সাথে যুদ্ধ করতে বিশেষ পারদর্শী। সুপারসনিক গতি এবং উন্নত ম্যানুভ্যারিটি ক্ষমতা সম্পন্ন এই বিমান শত্রুর উপর নিমেষে আঘাত হেনে উড়ে জেতে পারে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে উত্তর ভিয়েতনাম এই বিমান ব্যবহার করে আমেরিকানদের বাঘা বাঘা বিমানকে ভুপাতিত করেছিল। কারগিল যুদ্ধে ভারতীয় পাইলটরা মিগ২১ বিমান দিয়ে পাকিস্তানি এফ-১৬ বিমানকে তাড়া করেছিল। একজন দক্ষ পাইলটের পরিচালনায় এই বিমান এক ভয়ঙ্কর বিধ্বংসী মারনাস্র। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীও অতীতে এই বিমান ব্যবহার করেছে। বর্তমানে আমাদের বিমান বাহিনী মিগ ২১ এর চাইনিজ ভার্সন এফ-৭ এয়ারগার্ড বিমান ব্যবহার করে।



MIG-29


মিগ২৯ বর্তমান সময়ের অন্যতম ভয়ঙ্কর একটি যুদ্ধবিমান । এটি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি ৪র্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান যা ১৯৮৩ সালে প্রথম সোভিয়েত বিমানবহরে অন্তর্ভুক্ত হয়।এর ন্যাটো কোডনেম হল ফুল্ক্রাম। মিগ২৯ একটি মাল্টিরোল কমব্যাট ফাইটার যা একইসাথে আকাশে ও ভূমিতে হামলার জন্য অত্যন্ত পারদর্শী। এর শক্তিশালী Klimov RD-33 আফটার বার্নিং টার্বো ফ্যান ইঞ্জিন নিমেষেই বিমানকে সাবসনিক থেকে সুপারসনিক গতিতে নিয়ে যেতে পারে। অত্যাধুনিক কোবরা ম্যানুভ্যারিটি ক্ষমতাসম্পন্ন এই বিমান শত্রুবিমানের মিসাইলকে ফাঁকি দিয়ে পুনরায় পাল্টা আক্রমন চালাতে পারে। সোভিয়েতরা এই বিমানকে তাদের  স্টেট ওফ আর্ট হিসেবে পরিচয় দেয়। এটি দীর্ঘদিন পশ্চিমা এবং ইউরোপিয়ান দেশ গুলোর  ফিয়ার ফ্যাক্টর ছিল। মিগ২৯ বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত একটি বিমান যা পৃথিবীর বিভিন্ন বিমানবাহিনীতে অত্যন্ত সফলতার সাথে পরিচালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে বর্তমানে ৮টি মিগ২৯ বিমান আছে। 



F-16



এফ ১৬ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ৪র্থ প্রজন্মের মাল্টিরোল ফাইটার। মার্কিন প্রতিষ্ঠান জেনারেল ডাইনামিকস এই বিমানের নকশা করে। বর্তমানে লকহিড মারটিন কোম্পানি এই বিমান উৎপাদন করছে। মিগ-২৯ বিমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মূলত এই বিমান নির্মাণ করা হয়। অফিসিয়ালি এই বিমানকে ফাইটিং ফ্যালকন বলা হলেও এর ভয়ঙ্কর ধ্বংস ক্ষমতার জন্য পাইলটরা একে ভাইপার বলে থাকে। ১৯৭৮ সালে সার্ভিসে আসার পর থেকে এই বিমান পৃথিবীর বহু দেশে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর পরিচালন খরচ অন্যান্য বিমান থেকে কম হওয়ায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিমান বাহিনীর কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। বর্তমানে তুরস্কসহ আরও কয়েকটি দেশে এই বিমানের লাইসেন্সড ভার্সন তৈরি করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,পাকিস্তান,তুরস্ক,ইসরায়েল,গ্রীস,ভেনেজুয়েলা,আরব আমিরাত সহ পৃথিবীর আরও অনেক দেশের বিমানবাহিনী এই বিমান ব্যবহার করে।


F-15 Eagle


এফ ১৫ ঈগল আমেরিকার বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান McDonnell Douglas এবং Boeing নির্মিত একটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। এটি মূলত একটি এয়ার সুপেরিয়রিটি ফাইটার। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর আমেরিকা F-X program হাতে নেয়। যার উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত মিগ সিরিজের বিমানগুলোকে আকাশযুদ্ধে পরাজিত করার জন্য দক্ষ এবং ক্ষিপ্র বিমান নির্মাণ করা। এরই ফলশ্রুতিতে হেভিওয়েট ফাইটার হিসেবে জন্মলাভ করে এফ১৫ ঈগল এবং লাইটওয়েট ফাইটার হিসেবে এফ-১৬ ফ্যালকন। পাশাপাশি ইউএস নেভির জন্য তৈরি করা হয় এফ-১৪ টমক্যাট। এফ-১৫ দুই ইঞ্জিন বিশিষ্ট সুপার সনিক বিমান যার সর্বোচ্চ গতি প্রতি ঘণ্টায় ২৬৬৫ কিলোমিটার। উপসাগরীয় যুদ্ধে আমেরিকা অত্যন্ত সফলভাবে এই বিমান ব্যবহার করে। বর্তমানে আমেরিকা ছাড়াও ইসরায়েল,জাপান ও সৌদি আরবের বিমানবাহিনীতে এই বিমান ব্যবহৃত হয়।


Eurofighter Typhoon

ইউরোফাইটার টাইফুন একটি অত্যাধুনিক ডেল্টাউইং মাল্টিরোল ফাইটার। এটি মূলত ইংল্যান্ড, জার্মানি, ইটালি ও স্পেনের চারটি বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের একটি যৌথ প্রকল্প। ১৯৮৩ সালে ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালি ও স্পেনের অংশগ্রহনে Future European Fighter Aircraft (FEFA) programme গ্রহন করা হয়। কিন্তু পরে ফ্রান্স এই প্রকল্প থেকে বেরিয়ে আসে এবং পরবর্তীতে তারা Rafale নামে একটি নতুন ফাইটার তৈরি করে। ফ্রান্স এই প্রকল্প থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বাকি দেশগুলো তাদের এই প্রকল্প অব্যাহত রাখে। ফলশ্রুতিতে ২০০৩ সালে প্রথম সার্ভিসে আসে ইউরোফাইটার টাইফুন। এটি দুই ইঞ্জিন বিশিষ্ট একটি অসম্ভব দ্রুতগতির সুপারসনিক সেমি- স্টিলথ ফাইটার।টাইফুনকে এফ-২২ র‍্যাপটর এর অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাবি করে এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।বর্তমানে ইংল্যান্ড, জার্মানি, ইটালি, স্পেন ছাড়াও সৌদি আরব,অস্ট্রিয়া প্রভৃতি দেশের বিমান বাহিনীতে এই বিমান ব্যবহৃত হচ্ছে। 



Saab JAS 39 Gripen


গ্রিপেন সুইডেনের তৈরি ডেল্টা উইং লাইটওয়েট মাল্টিরোল ফাইটার। ১৯৭৯ সালে সুইডেন সরকার একটি শক্তিশালী ও কার্যকরী বিমান নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহন করে যা একইসাথে আকাশ যুদ্ধ, ভূমিতে বোমাবর্ষণ ও গোয়েন্দাগিরি করার জন্য বিশেষভাবে পারদর্শী।এটি প্রথম সার্ভিসে আসে ১৯৯৭ সালের পহেলা নভেম্বর।সুইডিশ এরোস্পেস কোম্পানি (SAAB) নির্মিত সুপারসনিক এই বিমানটির সর্বোচ্চ গতি ম্যাক ২ (২২০৪ কিঃমিঃ/ ঘণ্টা)/ইউরোপিয়ান এবং ন্যাটো স্ট্যান্ডার্ডে তৈরি এই বিমানের পরিচালন ব্যয় তুলনামুলকভাবে কম।বর্তমানে সুইডেন ছাড়াও দক্ষিন আফ্রিকা, থাইল্যান্ড,  ইংল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেক প্রজাতন্ত্রের বিমান বাহিনীতে এই বিমান ব্যবহৃত হচ্ছে।




Sukhoi Su-27


সুখোই এসইউ-২৭ সোভিয়েত রাশিয়া নির্মিত একটি সুপারসনিক যুদ্ধবিমান। এর ন্যাটো রিপোরটিং নাম হল Flanker । ১৯৬৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকার "F-X" program সম্পর্কে জানতে পারে। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তারা TPFI program গ্রহন করে যার উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার এফ-১৫ এবং এফ-১৬ বিমানগুলোকে আকাশযুদ্ধে প্রতিহত করার জন্য দ্রুতগামী ও শক্তিশালী বিমান নির্মাণ করা। ফলশ্রুতিতে সার্ভিসে আসে মিগ-২৯ এবং এসইউ-২৭ বিমানগুলো। এসইউ-২৭ একটি সুপার ম্যানুভারেবল ডেল্টাউইং বিমান যা অত্যাধুনিক রাডার,সেন্সর এবং ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত। দুটি শক্তিশালী Saturn/Lyulka AL-31F turbofans ইঞ্জিনবিশিষ্ট এই বিমানের সর্বোচ্চ গতি ম্যাক ২.৩৫ বা ২৫০০ কিমি./ঘণ্টা। ১৯৮৪ সালে সার্ভিসে আসার পর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিমানবাহিনী এই বিমান ব্যবহার করে। বর্তমানে রাশিয়া,গণচীন, এঙ্গোলা, বেলারুশ,ইথিওপিয়া, ভিয়েতনাম, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, ইউক্রেনসহ পৃথিবীর বহু দেশের বিমানবাহিনী এই বিমান ব্যবহার করছে।





Dassault Rafale


রাফালে ফ্রান্সের Dassault Aviation নির্মিত একটি ডেল্টাউইং মাল্টিরোল ফাইটার। ১৯৭০ সালে ফ্রান্স সরকার তাদের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা গ্রহন করে। তারা ইংল্যান্ড, জার্মানি, ইটালি ও স্পেনের সাথে ১৯৮৩ সালে ইউরোফাইটার প্রকল্পে যোগ দেয়। কিন্তু এই প্রকল্প আশানুরূপ না হওয়ায় পরবর্তীতে ফ্রান্স প্রকল্প থেকে বেরিয়ে আসে এবং নিজস্ব প্রযুক্তি ও ডিজাইনে একটি কার্যকর মাল্টিরোল ফাইটার নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহন করে। ফলশ্রুতিতে ২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বর সার্ভিসে আসে রাফালে বিমানটি। রাফালে বিমানটিতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির রাডার,সেন্সর সিস্টেম, কম্পিউটার সংযোজিত হয়েছে । দুটি Snecma M88 ইঞ্জিনসংবলিত এই বিমানটি অত্যন্ত দ্রুতগামী। এর সর্বোচ্চ গতিবেগ ম্যাক ১.৮ বা ২১৩০ কিমি./ ঘণ্টা। এটি দিবারাত্রি যুদ্ধের উপযোগী একটি অত্যন্ত কার্যকর বিমান। ফ্রান্সের নৌ ও বিমান বাহিনীতে বর্তমানে এই বিমান ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও ভারতীয় বিমান বহরে এই বিমান যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।



Chengdu J-10



চেংডু জে-১০ গণচীনের তৈরি একটি মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান। চীনের Chengdu Aircraft Industry Group (CAC) নির্মিত এই বিমানটি সকল আবহাওয়ায় ব্যবহার উপযোগী একটি সুপারসনিক বিমান। পশ্চিমা বিশ্বে এই বিমানটি Vigorous Dragon নামে পরিচিত। বর্তমানে রাশিয়ান Saturn AL-31 ইঞ্জিনে পরিচালিত এই ফাইটারের পরবর্তীতে ভার্সন গুলোতে চীনের নিজস্ব WS-10A (WoShan-10A) Taihang ইঞ্জিন ব্যবহার করা হবে। চীনা বিমানবাহিনীর অন্যতম একটি স্তম্ভ হিসেবে এই বিমানটি পরিচিত। এর সর্বোচ্চ গতি ম্যাক ২.২ যার ফলে এটি নিমেষেই সুপারসনিক স্পিডে শত্রুবিমানকে ধাওয়া করতে পারে। চীনের নিজস্ব প্রযুক্তির রাডার, সেন্সর, ককপিট ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ সংযোজিত এই বিমানটি অত্যন্ত আধুনিক ও যুগোপযোগী। বর্তমানে চীনের বিমানবাহিনীতে ২৬০টির বেশি জে-১০ বিমান আছে। শীঘ্রই পাকিস্তান বিমানবাহিনীতেও (২০১৪-১৫) এই বিমান সংযোজিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।





Dassault Mirage 2000

মিরেজ ২০০০ ফ্রান্সের ডাসাল্ট এভিয়েশন নির্মিত একটি ৪র্থ প্রজন্মের মাল্টিরোল ফাইটার। এটি একটি হালকা ধরনের বিমান যা ৭০ এর দশকের বিমান মিরেজ III এর উন্নত সংস্করন হিসেবে সার্ভিসে আসে । ডাসাল্ট এভিয়েশন প্রস্তাবিত মিরেজ২০০০ প্রজেক্টটিকে ফ্রান্স সরকার ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭৫ সালে অনুমোদন করে এবং ১৯৮২ সালে মিরেজ ২০০০ প্রথম সার্ভিসে আসে। মিরেজ২০০০ এর অনেকগুলো  আপগ্রেড ভার্সন নির্মিত হয়েছে যেমনঃ মিরেজ২০০০N এবং মিরেজ২০০০D, মিরেজ২০০০-৫ ইত্যাদি। একটি SNECMA-M53 Turbofan ইঞ্জিন সংবলিত এই বিমানটির সর্বোচ্চ গতি ম্যাক ২.২  অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় ২৫৩০ কিমি.।এটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির রাডার,এভিয়নিক, ককপিট ও ক্ষেপনাস্র সজ্জিত একটি বিমান যা একইসাথে এয়ার টু এয়ার কমব্যাট এবং ভূমিতে বোমাবর্ষণের জন্য অত্যন্ত পারদর্শী। বর্তমানে ফ্রান্সের বিমান বাহিনী ছাড়াও ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তাইওয়ান, গ্রীস, মিশর, কাতার, পেরু, ব্রাজিল ইত্যাদি দেশের বিমান বাহিনী মিরেজ২০০০ বিমানটি সাফল্যের সাথে  ব্যবহার করে আসছে।

সোমবার, ১৪ জুলাই, ২০১৪

বিপ্লবের বরপুত্র আর্নেস্তো চে গুয়েভারা

বিপ্লবের বরপুত্র আর্নেস্তো চে গুয়েভারা


rajibrahamnkhan.blogspot.com


র্নেস্তো গুয়েভারা ডেলা সেরনা। দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের উজ্জ্বল স্বাক্ষরে শুধুই পরিচিত নাম ‘চে’। জীবন জয়ের সংগ্রামী ধ্রুবতারা, আর্নেস্তো চে গুয়েভারা। আর্নেস্তো গুয়েভারা লিঞ্চ ও ডে লা সেরনার গর্ভের সন্তান। ১৯২৮ সালের ১৪ জুন পৃথিবীর আলোয় উদ্ভাসিত। ১৯৫২ সালে বুয়েন্স আয়ার্স থেকে ডাক্তার হয়েই পুরো লাতিন আমেরিকার সাধারণ মানুষের জীবন-সংগ্রাম উপলদ্ধির জন্য পরিভ্রমণ। ১৯৫৪ সালে সিআইএ পরিচালিত এক সামরিক অভিযানে গুয়াতেমালার জাকাবো আরবেনজের নির্বাচিত সরকারের উৎখাত সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী। রাজনৈতিক কার্যকলাপের দায়ে মৃত্যু পরোয়ানা জারি। গুয়াতেমালা ত্যাগ করে বাধ্য হয়ে মেক্সিকোতে আশ্রয় গ্রহণ করেন চে। কিউবার স্বৈরতন্ত্রী সরকার ফুলজেনসিও বাতিস্তাকে ক্ষমতাচ্যুতের উদ্দেশে নির্বাসিত কিউবার বিপ্লবীরা সেই সময়ে মেক্সিকোতে।

সেখানেই বিপ্লবীদের সাথে ঘনিষ্ঠতা এবং ফিদেল কাস্ত্রোর সান্নিধ্য লাভ। ১৯৫৫ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর সিয়েরা মায়েস্ত্রা পাহাড় থেকে কিউবার বাতিস্তা সরকারকে উৎখাতের পরিকল্পনায় কিউবান বিপ্লবীদের সঙ্গী এবং চিকিৎসক। ১৯৫৭ সালের জুলাইতে সশস্ত্র বিপ্লবী বাহিনীর প্রথম কমান্ডার। ১৯৫৯ সালে তীব্র সংগ্রামী লড়াইয়ে বাতিস্তা সরকারের পতন। চে তখন নতুন বিপ্লবী সরকারের অন্যতম নেতা। এরপর জাতীয় ভূমি সংস্কার ও শিল্প দপ্তরের প্রধান। জাতীয় ব্যাংকের সভাপতি, শিল্প দপ্তরের মন্ত্রী। ১৯৬৫ সালে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা। সারা পৃথিবীজুড়ে কিউবার প্রতিনিধিত্ব। আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও রাষ্ট্রপুঞ্জে কিউবার প্রধান বক্তা। ১৯৬৫ সালের এপ্রিলে অন্যান্য দেশের মুক্তির সংগ্রামে স্বশরীরে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে কিউবা ত্যাগ। কিছু সময় আফ্রিকার কঙ্গোতে অবস্থান এবং পরে ফিদেল কাস্ত্রোর ব্যবস্থাপনায় গোপনে কিউবায় প্রত্যাবর্তন। ১৯৬৬ সালের নভেম্বরে বলিভিয়ার নিপীড়িত মানুষের জীবনযুদ্ধে ছদ্মবেশে বলিভিয়ায় প্রবেশ। কিউবান বিপ্লবী ও বলিভিয়ার নিপীড়িত মানুষদের নিয়ে গেরিলা বাহিনী গঠন ও বলিভিয়ার সামরিক সরকারের উৎখাতের জন্য গেরিলা অভিযান শুরু। একের পর এক সফল অভিযান। সারা বিশ্ব তখন আন্দোলিত। নিদারুণ ঝঞ্চা বিক্ষুদ্ধ প্রতিকূল সময়ের এক বিরল যোদ্ধা ও সেনাপতি। ৮ অক্টোবর ১৯৬৭ সালে আমেরিকার বংশবদ প্রতিক্রিয়াশীল বলিভিয়ান সামরিক বাহিনীর হাতে আহত এবং ৯ অক্টোবর ওয়াশিংটনের নির্দেশে সরাসরি গুলির আদেশে নিহত।

বিপ্লবের আইকন

১৯৬০ সালের ৫ মার্চ চে’র বিখ্যাত সেই ছবিটি তোলেন আলোকচিত্রী আলবের্তো কোর্দা। ঠিক তার এক দিন পূর্বে হাভানা বন্দরে বোমা ও বিস্ফোরক বোঝাই একটি ফরাসি মালবাহী জাহাজ বিস্ফোরিত হয়ে মারা যায় ৮০ জন কিউবান। তাদের গণÑশেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দিতে সেদিন সেখানে গিয়েছিলেন চে। আর তখনই জ্বলে ওঠে কোর্দার ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। ফ্রেমবন্দী হয় পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ এই আলোকচিত্র। ছবিটি তোলার পরে অনেকদিন কোথাও প্রকাশিত হয়নি ছবিটি। কোর্দার স্টুডিওতে যাঁরা আসা-যাওয়া করতেন তাঁদের চোখেই শুধু পড়েছে দেয়ালে ঝুলে থাকা ক্রুদ্ধ, বিষণ্ন এক বিপ্লবীর মুখ। সাত বছর পর চে’র ছবিটি দেখে আকৃষ্ট হন ইতালির বামপন্থী প্রকাশক ও বুদ্ধিজীবি গিয়াংগিয়াকোমো ফেলত্রিনেলিঞ্চ। ইতালিতে ছবিটি নিয়ে আসেন তিনি। তাঁর মাধ্যমেই প্রথমে পোস্টার আকারে ইউরোপে ছবিটি ছড়িয়ে পড়ে চে’র ছবি। শোষণ, বৈষম্য ও পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠে চে’র ছবি। চে গুয়েভারা নিজেই একটি ব্র্যান্ড। এই ব্র্যান্ডের লোগো হচ্ছে চে’র বিপ্লবী জীবন যার অর্থ পরিবর্তন। আজ চে’র ছবি যুদ্ধ ও বিশ্বায়নবিরোধী তথা পরিবেশবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

এক কিংবদন্তি বিপ্লবীর জন্ম 

১৪ জুন ১৯২৮ সাল। আর্নেস্তো গুয়েভারা লিঞ্চ ও সেলিয়া ডে লা সেরনার ঘরে জন্ম নিলো এক শিশু লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী ইতিহাসের জ্বলজ্বলে এক নক্ষত্র। জন্ম নিলো দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের উজ্জ্বল স্বাক্ষরের পরিচিত একটি নাম চে। আর্জেন্টিনার প্রথা অনুযায়ী বাবার নামানুসারে রাখা হলো তাঁর নাম আর্নেস্তো গুয়েভারা।
রোজারিও ডি লা ফেতে নির্ধারিত সময়ের এক মাস আগে জন্ম নেওয়া নবজাতক পেল আরও দুটি নাম : আর্নেস্তো এবং তেতে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য চে গুয়েভারার শিরায় একই সঙ্গে বইছিলো আইরিশ ও স্পেনিস রক্ত। তাঁর মা সেলিয়া ছিলেন স্পেনিয় এবং আমেরিকান রক্ত বইছে এমন এক অভিজাত জমিদার পরিবারের মেয়ে।

হাঁপানিও বিপ্লব থেকে টলাতে পারেনি চে’কে

চে গুয়েভারা হাঁপানিতে আক্রান্ত হন, হাঁপানি নিয়েই তাঁর পথ চলা। ১৯৩০ সালের ২ মে সুইমিং পুলের ঠাণ্ডা পানিতে দুই বছরের চে'কে গোসল করাতে গিয়েই বাধে বিপত্তি। সেই প্রথম তাঁকে আক্রমণ করে হাঁপানি। তারপর আমৃত্যু তাঁর পিছু ছাড়েনি হাঁপানি। মায়ের কাছে তাঁর শেখা প্রথম বুলির একটি ছিল ইনজেকশন। ধারণা করা হয় চে গুয়েভারার লৌহ কঠিন মনোবলের পিছনে হাঁপানির অবদান সবচেয়ে বেশি।


চে যখন খেলোয়াড়

বিপ্লবী জীবনের মতোই চে ছিলেন একজন ভালো খেলোয়াড়। রাগবি ছিলো তাঁর পছন্দের খেলা। হাঁপানির কারণে মাঝে মাঝে মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে তাঁকে। দুর্দান্ত খেলার জন্য তাঁর নামই হয়ে যায় ‘ফিউসার’ (উন্মত্ত)। একবার বাবা-মা তাঁকে জোর করে রাগবি ক্লাব থেকে বের করে আনলেন। কিন্তু নাছোড়বান্দা চে গোপনে যোগ দিলেন আরেকটি ক্লাবে।
চে’র আরেক নেশা ছিলো দাবা। কিশোর বয়সেই এক প্রতিযোগিতায় আর্জেন্টিনার বিখ্যাত দাবাড়– মিগুয়েল নাজদর্ফকে ড্রতে রুখে দিয়ে সবাইকে চমকে দেন। রুশ দাবা চ্যাম্পিয়ন ভিক্টর করতচয়নের সঙ্গে কিউবার শিল্প মন্ত্রণালয়ে এক দাবার আয়োজন করেছিলেন তিনি। ১৯৬৩ সালে টেলিফোনে কিংবদন্তির দাবাড়ু ববি ফিশারের সঙ্গেও দাবা খেলেছেন চে।


লেখক যখন চে গুয়েভারা

বিপ্লবী এই মানুষটির লেখালেখির পরিমাণ জানলে অনেকেই চমকে উঠবেন। আমরা শুধু তাঁর লেখা গোটা দশেক বইয়ের নাম জানি। এর বাইরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাঁর অনেক লেখা। শুধু কিউবান ভাষায় তাঁর ৭০ টি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। বেনামে, ছদ্মনামে লিখেছেন আরও ২৫ টি নিবন্ধ। পাঁচটির মতো বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন।
১৯৫৮ থেকে ১৯৬৫ এই আট বছরে শুধু ভাষণ আর সাক্ষাৎকারই দিয়েছেন আড়াইশ’র মতো। চিঠি পাওয়া গেছে ৭০ টি। তাঁর লেখালেখি নিয়ে এখন পর্যন্ত বের হয়েছে ৯ খণ্ডের রচনাবলি। এসবই তিনি করেছেন ৩৯ বছরের জীবনে, যার সিংহভাগই ব্যয় হয়েছে বিপ্লবের আর ভ্রমণে।

চে’র বিখ্যাত চুরুট

সব সময় অতিরিক্ত ধুমপান করতেন চে। সহকর্মীরা তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তা করতেন। শেষ পর্যন্ত একদিন তাঁদের দিকে চেয়ে আপস করলেন চে গুয়েভারা; জানালেন, ‘আগামীকাল থেকে আমি কেবল একটা করে চুরুট খাবো।’ পরদিন কথামতো একটা চুরুট নিয়েই হাজির হলেন তিনি। তবে সেই চুরুটের দৈর্ঘ্য ছিলো প্রায় ১ মিটার।
কমিউনিস্ট থেকে ব্যাংকার চে
কিউবা বিপ্লবের পর, ক্ষমতা গ্রহণের পর চে গুয়েভারাকে প্রথম কিউবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করেন ফিদেল কাস্ত্রো। এই পদ গ্রহণ নিয়ে আছে মজার এক ঘটনা। বিপ্লবীদের এক অধিবেশনে কাস্ত্রো জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই কামরায় কি কোন ইকোনমিস্ট আছেন?’ ভুলে চে শুনলেন, ‘এখানে কি কোনো কমিউনিস্ট আছেন?’ অতএব বিনা দ্বিধায় হাত তুললেন চে। কাস্ত্রো বললেন, ‘চমৎকার! আপনিই হবেন আমাদের ব্যাংক অব ন্যাশনালের প্রেসিডেন্ট।’ এভাবেই ব্যাংকার বনে যান চে গুয়েভারা।

বোহেমিয়ান চে

বিপ্লবের পোড়া গন্ধ এসে নাকে লাগলো চে’র। ঘুরে দেখতে ইচ্ছা জাগলো সারা লাতিন আমেরিকা। সঙ্গী ছোটবেলার বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদোকে নিয়ে মোটর সাইকেলে পুরো লাতিন আমেরিকা পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা করলেন চে। পুরোনো একটা মোটর সাইকেলের পিঠে চড়ে বেড়িয়ে পড়লেন দুই বন্ধু। চে’র বয়স তখন ২৩ বছর। চিলি পৌঁছুলেন আন্দিজ পর্বতমালা অতিক্রম করে। একপর্যায়ে গোড়া থেকেই সমস্যা সৃষ্টি করতে থাকা মোটর বাইকটি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। অবৈধভাবে বলিভিয়াগামী একটা মালবাহী জাহাজে চেপে বসলেন দু’জনে। এখানে বিশাল আয়তনের খনি চুকুইকামাতা দেখার সুযোগ মিললো। উত্তর আমেরিকানদের পরিচালিত এই খনিতে সাধারণ শ্রমিকদের বঞ্চণার চিত্র পরিষ্কার হয়ে উঠলো। অকুতোভয় চে এখান থেকে রওনা হলেন পেরুর উদ্দেশে। একে একে পাড়ি দিলেন টিটাকাকা হ্রদ, কুজকো আর মাচু পিচু। তারপর আমাজনের ভাটি ধরে চলে এলেন সান পাওলোর কুষ্ঠরোগীদের কলোনিতে। এত বছর পরও সেখানকার কুষ্ঠরোগীরা স্মরণ করে অদ্ভুত দু’জন মানুষের কথা, দস্তানা ছাড়াই যারা তাদের সঙ্গে করমর্দন করেছিলো, ফুটবল খেলেছিলো। তাদের তৈরি করে দেওয়া ভেলায় চড়েই আমাজনের ভাটি ধরে যাত্রা অব্যাহত থাকলো অভিযাত্রীদের। জুলাইয়ের শেষে একসঙ্গে সাত মাস ভ্রমণের পর কারাকাসে পৌঁছে বিচ্ছিন্ন হলেন দু’জন। চে’র হাতে তখন মাত্র ১ ডলার।
‘মোটরসাইকেল ভ্রমণ’ খ্যাত এই সফর চে গুয়েভারার জন্য ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে লাতিন আমেরিকার সাধারণ মানুষের কাছাকাছি আসার এবং তাদের দুঃখÑদুর্দশা অনুভবের সুযোগ পান চে। মাচু পিচুর ধ্বংসাবশেষ দেখার সময় রেড ইন্ডিয়ানদের কষ্ট উপলব্ধি করে তিনি বলেছিলেন, ‘এই ভ্রমণের কারণে আমি আবিস্কার করেছি দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতা আর প্রতিনিয়ত নিপীড়নের কারণে যেসব শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে তাদের সুস্থ করে তোলা এককথায় অসম্ভব।’

ফিদেলের সঙ্গে দেখা ও বিপ্লবী জীবনের আমন্ত্রণ

১৯৫৫ সালে এক কন্যা সন্তানের জনক হন চে গুয়েভারা। একই বছর জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে মেক্সিকোতে তাঁর সাথে দেখা হলো কিউবার দেশান্তরী বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে। স্বৈরশাসক বাতিস্তাকে উচ্ছেদের জন্য কিউবায় বিপ্লবীদের যে দলটা পাঠানোর পরিকল্পনা করছিলেন, তার জন্য একজন চিকিৎসক খুঁজছিলেন ফিদেল। প্রস্তাবটা পাওয়ার পর সম্মতি জানাতে এক সেকেন্ডও দ্বিধা করেননি চে। পরে এক চিঠিতে বাবাকে চে লিখেছেন, ‘এক তরুণ কিউবান নেতা তাঁর দেশের সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আমাকে। অবশ্যই আমি এটা গ্রহণ করেছি, আর এখন খুঁজে পেয়েছি আমার পথ।’ এই পথই তাঁকে নিয়ে গেছে কিউবা থেকে কঙ্গো, কঙ্গো থেকে বলিভিয়া আর বলিভিয়া থেকে অমরত্বের সাম্রাজ্যে।

গ্রানমা জাহাজ নিয়ে বিপ্লবের ডাক
প্রথমে ৮২ জন বিপ্লবীকে নিয়ে কিউবার লাস কালোরাডাস উপকূলে ভিড়ল ছোট্ট কেবিন ক্রজার গ্রানমা। গ্রানমা থেকে নেমেই সুসজ্জিত এক সেনাদলের মুখোমুখি হলেন চে। প্রথম ধাক্কাতেই অধিকাংশ সহযোদ্ধাকে হারালেন তিনি। বেঁচে যাওয়া ডজন খানেক বিপ্লবী আশ্রয় নিলো ৮০ মাইল দীর্ঘ আর ৩১ মাইল প্রশস্ত সিয়েরা মায়েস্ত্রা পর্বতমালায়। যেকোনো মুহূর্তে হত্যার জন্য অস্ত্র প্রস্তুত রেখে স্থানীয় কৃষক আর সাধারণ মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে শুরু করলেন চে। তাদের সঙ্গে নিয়ে আস্তে আস্তে দলের লোকসংখ্যা বাড়াতে লাগলেন চে। এভাবেই প্রথম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন চে। পরে সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লেখেন, ‘আমার সঙ্গে ছিলো ওষুধভর্তি একটা থলে আর বুলেটপূর্ণ একটা কেস। দুটো এক সঙ্গে বহন করা ছিলো আমার জন্য খুবই কষ্টকর। একসময় বুলেটের কেসটা হাতে তুলে নিলাম, পেছনে পড়ে রইলো ওষুধের থলে।’
কিউবায় চে’র মিশন
২ জানুয়ারি ১৯৫৯ সাল। অবস্থা বেগতিক দেখে নতুন বছরের শুরুতেই দেশ ছেড়ে সান্তো দমিনগো পালালো কিউবার প্রেসিডেন্ট বাতিস্তা। বিপ্লবী দলের কমান্ডার চে গুয়েভারার নেতৃত্বে কিউবার রাজধানী হাভানায় প্রবেশ করলো বিপ্লবীরা। অভূতপূর্ব আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়ে তাদের বরণ করে নিলো গোটা কিউবার আমজনতা। দীর্ঘায়িত হলো নতুন বছরের উদযাপনী উৎসব। কিউবা উপকূলে রক্তঝরানো আর হতাশা জাগানো প্রবেশের পর ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে ২৫ টি মাস। চে’র বয়স তখন ত্রিশ বছর।
আমজনতার সঙ্গে চে
১৪ মার্চ ১৯৬৫ সাল। কিউবার শুভেচ্ছাদূত হিসেবে আমেরিকা ও আফ্রিকা ভ্রমণ শেষে কিউবায় ফিরলেন চে। বিমানবন্দরেই তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো। রুদ্ধদ্বার কক্ষে দীর্ঘ ৪০ ঘণ্টা বৈঠকে মিলিত হলেন দু’জন। আজও মানুষ জানে না, সেদিন তাঁদের মধ্যে আসলে কী কথা হয়েছিলো। তার পরই অদৃশ্য হয়ে গেলেন চে। গুজব ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে। আর্জেন্টিনা আর ভিয়েতনামে তাঁকে দেখা গেছে এমন সংবাদও পাওয়া গেলো। মেক্সিকোয় রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়ার খবরও শোনা গেলো। অন্যরা আবার বিশ্বাস করতে শুরু করলো যে, তিনি হয় মারা গেছেন নয়তো হাভানা কারাগারে তিলে তিলে ক্ষয় হচ্ছেন। ২০ এপ্রিল কাস্ত্রো সাংবাদিকদের জানালেন, ‘কমান্ডার চে গুয়েভারার ব্যাপারে আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, বিপ্লবের জন্য তাঁকে যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সব সময় সেখানেই থাকেন তিনি।’
৩ অক্টোবর কাস্ত্রোকে লেখা চে’র একটি চিঠি প্রকাশ করলেন কাস্ত্রো। এপ্রিলের তারিখ দেওয়া চিঠিতে চে লিখেছেন, ‘আমি মনে করি, কিউবায় আমি আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছি। অন্যান্য দেশও আমার আন্তরিক প্রচেষ্টার অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছে। কিউবার নেতা হওয়ার কারণে আপনি যা করতে অপারগ আমি তা করতে পারি। আমাদের আলাদা পথে চলার সময় হয়েছে।’
একই সময় মা-বাবাকেও একটি চিঠি লেখেন চে, ‘আবার আমি পথে নেমেছি। অনেকেই হয়তো অ্যাডভেঞ্চারার বলবে। আমি তা-ই, তবে একটা পার্থক্য আছে। আমি সেই ধরনের, অ্যাডভেঞ্চারার, যে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনের ঝুঁকি পর্যন্ত নিতে পারে।’

কঙ্গোতে বিপ্লবের জন্মদান
১৯৬৫-১৯৬৬ সালে আফ্রিকায়ও বিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে দিয়েছিলো চে। এই উদ্দেশেই গোপনে হাজির হলেন কঙ্গোয়। সেখানকার সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ত্রাণকর্তা, ওরা তাঁর নাম দিয়েছিলো মুগান্দা (ত্রাণকর্তা), আর গেরিলাদের কাছে তিনি ছিলেন কমান্ডার ‘তাতু’। তখনকার সময়ে তাঁর সরল উক্তি, ‘আমি এমন এক সেনাদলের স্বপ্ন দেখি যারা কঙ্গোবাসীর জন্য বিজয় ছিনিয়ে আনবে।’
এর ১১ মাস পর আফ্রিকান বিপ্লবীদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে পরিসমাপ্তি ঘটে তাঁর স্বপ্নের। চে এই বিপ্লবীদের নাম দিয়েছিলেন ‘পর্যটক’, লড়াই করার চেয়ে বড় বড় শহরগুলোয় আরাম-আয়েশ করেই দিন কাটানোই ছিলো যাদের পছন্দ। এদিকে পর পর কয়বার আমাশয়, ম্যালেরিয়া আর হাঁপানির ভয়াবহ আক্রমণে চে’র ওজন নেমে এল ৫০ কেজির নিচে। গোপনে কিউবায় ফেরার পূর্বে দার-ঊস-সালাম আর প্রাগে চিকিৎসা নিলেন চে।

ফিদেল কাস্ত্রোকে লেখা চে’র শেষ চিঠি
ফিদেল,
এ মুহূর্তে অনেক কিছুই মনে পড়ছে আমার। মারিয়া অ্যান্তোনিয়র বাসায় যেদিন আপনার সাথে দেখা হলো, যখন আপনি আহবান জানালেন বিপ্লবের প্রস্তুতির সাথে জড়িত সকল উত্তেজনায় আমিও যেন অংশ নেই। একদিন কারা যেন জানতে চাইলো আমাদের মৃত্যুর সংবাদ কাকে আগে অবহিত করতে হবে, এবং ঘটনাটার বাস্তবিক সম্ভাবনা আমাদের সবাইকে বিচলিত করে তুললো। পরে আমরা জেনেছি বিপ্লবের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সত্য হলো কেউ জিতবে নতুবা মৃত্যুবরণ করবে (যদি তা হয় প্রকৃত বিপ্লব)।
এভাবেই বিজয়ের যাত্রাপথে শহীদ হন অগণিত কমরেড। সবকিছুতেই নাটকীয়তার সেই স্বর আজ অনেক বেশি পরিণত। কিউবার বিপ্লবের প্রতি যে কর্তব্যবোধ আমাকে এর সঙ্গে যুক্ত করেছিল, আমি অনুভব করছি, সে দায়িত্ব আমি সম্পন্ন করতে পেরেছি, এবং আমি বিদায় জানাচ্ছি আপনাকে, কমরেডদের, আপনার জনগণকে যারা এখন আমারও। আমি আনুষ্ঠানিকভাবে পার্টির নেতৃত্ব, মন্ত্রীর পদ, কমান্ডারের পদমর্যাদা এবং কিউবার নাগরিকত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে আনছি। আইনগত আর কিছুই কিউবার সঙ্গে আমাকে সম্পর্কযুক্ত করবে না। অবশিষ্ট যে বন্ধনটুকু থাকবে তা ভিন্ন চরিত্রের, কোনোভাবেই তাকে ভেঙে ফেলা যায় না, যেকোনো নিয়োগচুক্তিকে খুব সহজেই যেভাবে ভাঙা যায়। অতীতের দিকে তাকিয়ে আমি বিশ্বাস করি বৈপ্লবিক বিজয়কে সুসংহত করার জন্য প্রয়োজনীয় সততা এবং যথাযথ নিষ্ঠা নিয়েই আমি কাজ করেছি।
আমার একমাত্র ব্যর্থতা সিয়েরা মায়েস্ত্রার প্রথম সময়গুলোয় আপনার প্রতি আমার আস্থার অভাব, এবং নেতা ও বিপ্লবী হিসেবে আপনার যোগ্যতাকে দ্রুত উপলব্ধি করতে পারার অক্ষমতা। এখানে আমি দুর্দান্ত কিছু সময় কাটিয়েছি, যুগপৎ দীপ্ত ও ক্যারিবীয় সংকটের ঝাপটায় বিমর্ষ দিনগুলোয় জনগণের সঙ্গী হওয়ার গৌরবও অর্জন করতে পেরেছি। সেই সময়গুলোয় আপনার চেয়ে মণীষাপূর্ণ নেতৃত্ব দেওয়া খুব কম রাষ্ট্রনায়কের পক্ষেই সম্ভব হতো। কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই আমি যে আপনাকে অনুসরণ করেছি, আপনার ভাবার, দেখার এবং বিপদ ও নীতির মূল্যবোধের প্রক্রিয়ার প্রতি আমি যে একাত্ম হতে পেরেছি, এ জন্য আমি গর্ববোধ করি। পৃথিবীর অন্য জাতিগুলো আমার ঐকান্তিক সংগ্রামের পথ চেয়ে আছে। তাদের ডাকেই আমি সাড়া দিচ্ছি, যদিও কিউবার রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার কারণে এ কাজে অংশ নেওয়া আপনার পক্ষে এ মুহূর্তে সম্ভব নয়। আমাদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় তাই এসে গেছে। এ কথা আমি জানাতে চাই, এই বিচ্ছেদ একই সঙ্গে আমার জন্য আনন্দ ও বিষাদের। একজন নির্মাতা হিসেবে এই রাষ্ট্রের প্রতি আমি রেখে যাচ্ছি আমার বিশুদ্ধতম প্রত্যাশা এবং আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষের একজনকে, এবং এমন একজন মানুষকে যিনি আমাকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এটা আমার আত্মার একটা অংশকে বিক্ষত করছে। নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে আমি সেই বিশ্বাসটুকুকেই সঙ্গী করে দাঁড়াবো যা আপনি আমার ভেতর বুনে দিয়েছেন, সঙ্গে থাকবে পবিত্রতম কর্তব্য পালনের সুখানুভূতি; এই সবকিছু দিয়েই আমি লড়বো সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, যেখানেই সে থাকুকনা কেনো। এ ব্যাপারটাই আমাকে স্বস্তি দিচ্ছে আর শুশ্রুষা করছে অন্তরের গভীরতম ক্ষতকে।
আরেকবার বলতে চাই, সব রকমের দায়দায়িত্ব থেকে কিউবাকে মুক্ত করে দিচ্ছি আমি, তবে এই রাষ্ট্রের উদাহরণ তার কাঁধে যে দায়িত্ব চাপাবে তা থেকে নয়। যদি আমার শেষ মুহূর্তগুলো আমাকে আবিস্কার করে অন্যকোনো আকাশের নিচে, তবু আমার শেষ ভাবনাগুলো এদেশের মানুষদের ঘিরেই থাকবে, বিশেষত আপনাকে। আমি আপনার শিক্ষা এবং দৃষ্টান্তের জন্য আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ, এবং আমি আমার সংগ্রামের চুড়ান্ত পরিণতি পর্যন্ত চেষ্টা করবো আপনার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে। আমাদের বিপ্লবেরর বিদেশনীতির প্রতি আমি সবসময় একাত্ম ছিলাম সামনেও থাকবো। যেখানেই থাকি আমি, একজন কিউবান বিপ্লবীর কর্তব্যবোধ আমার মধ্যে থাকবে, এবং সে অনুসারেই আমি কাজ করে যাবো।
এ বিষয়ে আমার তিলমাত্র লজ্জা নেই যে, আমার স্ত্রী এবং সন্তানদের জন্য বৈষয়িক কোনো কিছুই রেখে যেতে পারলাম না; আমি সুখী এটাই সে রাস্তা। তাদের জন্য অতিরিক্ত কিছুই আমি চাই না, কারণ জীবনধারণ আর শিক্ষা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রই যথেষ্ট দেবে তাদের। আপনাকে এবং আমাদের জনগণকে অনেক কিছুই আমি বলতে পারতাম, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে তার কোনো প্রয়োজন নেই। শব্দের কাছে আমি যা প্রত্যাশা করি তা প্রকাশের সামর্থ্য তার নেই, এবং এও আমার মনে হয় না যে, লিখে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরিয়ে তোলার কোনো মানে আছে। আমার সমস্ত বিপ্লবী স্পৃহা দিয়ে আপনাদের আলিঙ্গন করছি। -চে
(‘চে গুয়েভারা রিডার : রাইটিংস অন পলিটিক্স অ্যান্ড রেভ্যুলেশন’, অবলম্বনে ইংরেজি থেকে অনুদিত)

জীবনের শেষ বিপ্লব এবং অমরত্বের সন্ধানে
হাভানার শান্তিপূর্ণ জীবন আর ভালো লাগলো না চে’র কাছে। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন চে। এবার যেতে হবে বলিভিয়া। মার্কিন বংশবদ প্রতিক্রিয়াশীলদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনতে কাক্সিক্ষত বিজয়। কিউবান সিক্রেট সার্ভিসের সহযোগিতায় ধূসর চুলের বছর চল্লিশের এক অভিজাত ভদ্রলোকের ছদ্মবেশ ধরলেন চে। মাথায় টাক তৈরির জন্য চুল ফেলে দিলেন। নিজেকে খাটো দেখানোর জন্য জুতার হিল পুরোপুরি ফেলে দিলেন। ঘন জঙ্গলের মতো ভ্রূ আর চোখে মোটা কাঁচের চশমা একেবারেই বদলে দিলো চেহারা।

যাত্রা নিরাপদ করতে দুটি উরুগুয়ের পাসপোর্টেরও ব্যবস্থা হলো। ছদ্মবেশের সাহায্যে শত্রুর চোখ ফাঁকি দিয়ে সহজেই বলিভিয়া ঢুকে পড়লেন চে। ১৮ জন বিশ্বস্ত কিউবানসহ মাত্র ৫০ জন লোক নিয়ে প্রথম গেরিলা ঘাটি স্থাপন করলেন। পুরনো একটি বাড়ির পাশে তৈরি হলো ক্যাম্প। গেরিলাদের খোঁড়া সুড়ঙ্গের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হলো খাবারদাবার আর অস্ত্র। আবহাওয়া প্রচণ্ড শুষ্ক। তার ওপর পোকামাকড়ের কামড়ে রীতিমতো অতিষ্ট বিপ্লবীরা। তাঁরা আশা করেছিলেন বলিভিয়ার কমিউনিস্ট পর্টির সহায়তা পাবেন। তারা তো তা করলই না, উল্টো চে’র দলে যোগ দিতে দলীয় সদস্যদের নিষেধ করলো।

এদিকে দুই পরাশক্তির মধ্যে যে শান্তির সূচনা হয়েছে তা ক্ষতিগ্রস্থ করতে নারাজ রাশিয়া। ফলে তড়াহুড়ো করে দলে লোক নিতে হয়েছে চে’কে। অল্প কিছুদিন পরেই এদের অনেকে পালিয়ে যায়, কেউ বা বেঈমানি করে। মার্চের দিকে চে অনুসন্ধান অভিযানে বাইরে থাকা অবস্থায় তাঁর ঘাটি দখল করে নিলো সেনাবাহিনী। শুরু হলো সত্যিকার গেরিলা জীবন। দিন যত গড়াতে লাগলো ততই কোণঠাসা হয়ে পড়তে লাগলো গেরিলারা। খাবার আর দরকারি ওষুধ পেতে পারেন হিগুয়েরায়, জানেন চে। তাই যাত্রাপথে বলিভিয়ান কর্তৃপক্ষ বড় গুপ্ত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। আশপাশের প্রতিটি এলাকায় প্রচুর সেনা মোতায়েন করা আছে নিশ্চিত জেনেও দলের লোকদের ১৮ সেপ্টেম্বর লা হিগুয়েরার উদ্দেশে মার্চ করার নির্দেশ দিলেন চে। শারীরিক ও মানসিক সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে যাওয়া লোকগুলোকে দিয়ে এই চেষ্টা করা পাগলামি ছাড়া আর কিছুই না। প্রায় পুরো পথটাই চলতে হবে লোক চলাচলের রাস্তা ধরে। ভীত কৃষক, স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা আর বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট জেনারেল রেনে বারিয়েনতোজের ঘোষণা করা ৫০ হাজার পেসো পুরস্কার পাওয়ার জন্য উন্মুখ বাউন্টি হান্টারদের সামনে দিয়ে যেতে হবে চে’র দলকে। গোড়া থেকেই সৃষ্টি হলো নানা বিশৃঙ্খলা। জাগুয়ার দিকে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে চলার সময় চোরাগুপ্তা হামলার শিকার হলো চে’র দল। মারা গেলেন মিগুয়েল, কোকো এবং জুলিও। দল নিয়ে গ্রান্ড নদীর দিকে যাওয়ার পথ ধরলেন চে।

অক্টোবরে প্রথম কয়েকটা দিন চে ১৬ জন বিপ্লবীর দল নিয়ে বেশির ভাগ সময় কাটান লা হিগুয়েরার উত্তরের পর্বতগুলোর চূড়ায়। আর রাতগুলো তাদের কাটে পর্বতগুলোর গুহায়। ৩ তারিখ রেডিওতে সহযোদ্ধা কেম্বা আর লিয়নের বন্দী হওয়ার খবর প্রচার করা হলো। তাঁরা দু’জনই চে’র অসুস্থতা ও বিপ্লবী সবরকমের গোপন পন্থা জানিয়ে দিলো সেনাবাহিনীকে। এ নিয়ে ডাইরিতে চে লিখেছেন, ‘এভাবেই সমাপ্তি ঘটলো বীরোচিত দু’জন গেরিলার।’ চে তাঁর দল নিয়ে লা হিগুয়েরার একটি পর্বতে ক্যাম্প করলেন। ৮ অক্টোবর সকালে বলিভিয়ার সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন গ্রে পেদ্রো আর তাঁর কোম্পানি এ এলাকার সবচেয়ে দুর্গম গিরিসংকটগুলোর একটি কুয়েব্রাডা ডি ইউরোর মাথায় অবস্থান নিলো। রাতের পথ চলা শেষে এখানেই বিশ্রাম নেওয়ার জন্য থেমেছে চে’র দল। রাতের অন্ধকারে আবার যাত্রা শুরুর আগ পর্যন্ত এখানেই অবস্থানের পরিকল্পনা করেছে চে। দুপুরের দিকে পেদ্রোর কোম্পানির একটা অংশ গেরিলাদের দেখে আক্রমণ করার চেষ্টা করে। সংঘর্ষে দু’জন সৈন্য মারা যায়, আহত হয় বেশ কয়েকজন। গেরিলাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে ছোট্ট এ দলটির দায়িত্বে থাকা লেফটেন্যান্ট সাহায্যের জন্য রেডিওতে পেদ্রোর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দেরি না করে বাকি সেনাদের নিয়ে গেরিলাদের অবস্থানের চারদিকে একটা বৃত্তের মতো তৈরি করে এগোলেন পেদ্রো। এদিকে সেনাবাহিনীকে বিভ্রান্ত করে পালানোর জন্য ছোট দলটাকে দু’টো অংশে ভাগ করলেন চে।

আর্নেস্তো চে গুয়েভারা’র নেতৃত্বে থাকা দলটি গিরিসংকট থেকে বের হওয়ার সবচেয়ে কাছের পথটার দিকে রওয়ানা হলো। কিন্তু ইতিমধ্যে প্রচুর সেনাতে ভরে গেছে রাস্তা। গেরিলারা সেনাদের গুলির নাগালের মধ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গে গুলিবৃষ্টির মুখে পড়তে হলো চে’র দলকে। ফিল্ডগ্লাসে গেরিলাদের আড়ালের খোঁজে দৌঁড়াতে দেখলেন পেদ্রো। সার্জেন্ট বার্নাডিনো হুয়ানকাকে দল নিয়ে গেরিলাদের অনুসরণ করে নিচে নেমে আসার নির্দেশ দিলেন পেদ্রো। কয়েক মিনিট পর ঘন ঝোপের আড়াল দিয়ে এগোতে থাকা এক গেরিলার দিকে সাবমেশিনগান ফায়ার করলেন হুয়ানকা। একটা গুলি চে’র মাথার টুপি উড়িয়ে দিলো। অপর দু’টো গুলি তাঁর পায়ে বিদ্ধ হলো, মাটিতে পড়ে গেলেন চে। রেঞ্জাররা জায়গাটাকে লক্ষ্য করে গুলি করতে শুরু করলো। উইলি (সাইমন কিউবা) নামের এক গেরিলা দৌঁড়ে এসে চে’কে গুলির লাইন থেকে সরিয়ে গিরিসংকটের এক পাশে আশ্রয় নিতে সাহায্য করলেন। গুটিসুটি মেরে ওপর দিকে উঠছেন এমন সময় কামান দাগার মুখে পড়লেন চে’র দল। তাঁদের আত্মসমর্পণ করতে বললো রেঞ্জাররা। প্রত্যুত্তরে একটা গাছের সঙ্গে শরীর মিলিয়ে দাঁড়িয়ে সেনাদের লক্ষ্য করে কারবাইন থেকে গুলি ছুঁড়তে শুরু করলেন চে। কয়েক সেকেন্ড পরেই কারবাইনের ব্যারেলে আঘাত হানা একটা গুলি এটাকে নিস্ক্রিয় করে দিলো। সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত ওপরে তুলে জোরে চিৎকার করে উঠলেন চে, ‘গুলি করো না। আমি চে গুয়েভারা। তোমাদের কাছে মৃত আমার চেয়ে জীবিত আমার মূল্য অনেক বেশি।’ কয়েক গজ দূরে উইলিও তাঁর রাইফেল ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করলেন।
রেডিওতে উর্দ্ধতন সামরিক কর্মকর্তা কর্নেল জেনটেনোর নির্দেশ পেয়ে দুই বন্দীসহ লা হিগুয়েরার উদ্দেশ্যে রওনা হলো রেঞ্জাররা। একটা কম্বলে চে’র আহত দেহ মুড়িয়ে বহন করছে চার সেনা। লা হিগুয়েরা পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। কিছু সময় পরে মাটির একটি স্কুলের স্যাতস্যাতে একটি কামরায় হাত-পা বেঁধে রাখা হলো চে গুয়েভারাকে। তাঁর সামনেই পড়ে আছে আন্তোনিও আর আর্তারার মৃতদেহ। অন্য একটি কামরায় রাখা হয়েছে অক্ষত উইলিকে। এদিকে এনতি পেরোদার নেতৃত্বে গেরিলাদের অপর দলটি সেদিন রাতে গিরিসংকটের ফাঁদ থেকে বের হয়ে এল। পরের কয়েক সপ্তাহে গেরিলাদের এই দ্বিতীয় দলটি ধরা পড়ে সেনাদের হাতে। বেঁচে যায় যারা তাদের মধ্যে অবশিষ্ট তিন কিউবান পমবো, বেনিগানো ও আরবানো চিলি হয়ে দেশে পালিয়ে যেতে সমর্থ হন। তিন বলিভিয়ান ইনতি, দায়রো আর নেতো গা ঢাকা দেন।

৮ অক্টোবর রাতে এবং ৯ অক্টোবর সকালে মেজর আয়োরা, কর্নেল আদ্রে সেলিচ ও ক্যাপ্টেন পেদ্রোসহ বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা চে’কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। গেরিলাদের সম্পর্কে কোন তথ্য ফাঁস না করলেও সেনা কর্মকর্তাদের সাথে উত্তপ্ত কয়েকটি বাক্যবিনিময় করেন চে। একসময় তরুণ এক সেনা কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করে তিনি কি ভাবছেন। শুরুতে জবাব না দিলেও সেনা কর্মকর্তাটি যখন বললেন তিনি সম্ভবত নিজের অমরত্বের কথা ভাবছেন। তখন চে বললেন, ‘আমি বিপ্লবের অমরত্বের কথা ভাবছি।’

চে’কে ধরার আনন্দে বেশি এ্যালকোহল নেওয়া এক তরুণ কর্মকর্তা বারবার তাঁকে আঘাত করার চেষ্টা করছিলো। ওই অবস্থাতেই তার মুখে লাথি মেরে জবাব দিলেন চে। সেলিচ যখন চে’কে জিজ্ঞেস করলেন বলিভিয়াকে কেন বেছে নিলেন। তখন চে এখানকার কৃষকদের দারিদ্র আর মানবেতর জীবনকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেন। তিনি কিউবান না আর্জেন্টাইন এটা জানতে চাইলে বললেন, ‘কিউবান, আর্জেন্টাইন, বলিভিয়ান, পেরুভিয়ান, ইকুয়েডরিয়ান ইত্যাদি... বুঝতে পারছো আশা করি।’
এদিকে রাজধানী লা পাজে প্রেসিডেন্ট বেরিয়েনতোস এবং উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্র ও সিআইএর সবুজ সংকেত পাওয়ার পর সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন, চে’কে কোনো অবস্থাতেই স্বাভাবিক বিচারের মুখোমুখি করা যাবে না, কারণ এতে বিশ্বব্যাপী তাঁর পক্ষে জনমত সৃষ্টির সম্ভাবনা প্রবল। সেনা কর্মকর্তারা ঠিক করলেন, দেরি না করে দ্রুত চে’র প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হবে এবং সরকারিভাবে জানানো হবে, যুদ্ধের সময় পাওয়া আঘাতে মারা গেছেন চে। সোমবার ৯ অক্টোবর সকালে ওয়াশিংটন থেকে চে’কে হত্যার নির্দেশ পেলেন লা হিগুয়েরার কর্মকর্তারা। তাদের আরও বলা হলো ননকমিশন্ড কোন কর্মকর্তা যেন কাজটা করেন।

৯ অক্টোবর দুপুরের একটু আগে কুয়েবার্ডা ডি ইউরোতে চে ও তাঁর সঙ্গীদের আবিস্কার করার ২৪ ঘন্টা পরে বলিভিয়ান সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের নির্দেশ পালন করতে ছোট্ট স্কুল ঘরটার দিকে রওনা হলেন সার্জেন্ট টেরান। কামরাটায় ঢুকে দেখলেন একপাশের দেয়ালে ঠেস দিয়ে অপেক্ষা করছেন চে। টেরানের আসার কারণ অনুমান করতে পেরেছিলেন চে। উঠে দাঁড়ানো পর্যন্ত টেরানকে অপেক্ষা করতে বললেন। এ সময় টেরান এত ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন যে, কাঁপতে কাঁপতে এক পর্যায়ে স্কুল থেকে বের হয়ে যান। কিন্তু কর্নেল সেলিচ আর জেনটেনোর নির্দেশে আবার চে’র কামরায় ফিরে আসতে হলো টেরানকে। এবার একবারও বন্দির মুখের দিকে না তাকিয়ে তাঁকে লক্ষ্য করে কারবাইন থেকে গুলি ছুঁড়তে শুরু করলেন। হাত ও পায়ে গুলি লেগে মাটিতে পড়ে যাওয়া চে কষ্ট চাপা দেওয়ার জন্য নিজের হাত কামড়ে ধরলেন। এসময় আবার গুলি করা শুরু করলো টেরান। ঘাতক বুলেট প্রবেশ করলো চে’র বুকে। ফুসফুস রক্তে রঞ্জিত হলো।

১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর মাত্র ৩৯ বছর বয়সে চির বিদায় নিলেন বিপ্লবের বরপুত্র আর্নেস্তো চে গুয়েভারা। মৃত্যুর পর ক্ষতবিক্ষত চে’র দেহ ভ্যালেগ্রান্দেতে নিয়ে যাওয়া হয় হেলিকপ্টারে করে; সেখান থেকে শেভ্রোলে ট্রাকে করে দ্রুত সেন ডি মাল্টা হাসপাতালে। এখানেই তাঁর দেহ থেকে ধুয়েমুছে রক্ত পরিস্কার করা হয়। তারপর বলিভিয়ার সেনাপ্রধান জেনারেল আলফ্রেদো ওবান্দোসহ অন্য সামরিক কর্মকর্তারা নিহত চে’কে দেখতে আসেন। ডাক্তার ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের শেষে সাংবাদিক, কৃষক আর সাধারণ মানুষ সারা রাত লাইন দিয়ে চে’কে দেখে যায়। তাঁর জ্যাকেটবিহীন খোলা দেহ, কোমর থেকে নিচ পর্যন্ত গেরিলা প্যান্ট। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, চে তখন আশ্চর্যজনকভাবে জীবন্ত ছিলেন। চোখ দুটি শুধু খোলাই ছিলো না, অসম্ভব রকম সুন্দর লাগছিলো। দুটি ঠোঁটে লেগেছিলো বিপ্লবের হাসি। চে’র এই ছবিটি যিশুখ্রিস্টের মতো ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। যে ছবি যিশুখ্রিস্টকেও হার মানিয়ে দিয়েছে কয়েকযুগ আগে।

এভাবেই চে’র দেহ ২৪ ঘন্টা রেখে দেওয়া হয়েছিলো। বিস্ময়ে আর সম্মানে তাঁকে দেখে যাচ্ছিলো মানুষ আর মানুষ। এরপর বলিভিয়া কর্তৃপক্ষ চে’র মৃত্যুর প্রমাণ রাখার জন্য তাঁর দুই হাত কেটে এবং প্লাস্টারে মুখের ছাপ নিয়ে সঙ্গীদের সাথে চে’কে কবর দিয়ে তা গোপন রাখা হয়। তাঁর মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে ১৯৬৮ সালের মার্চে প্রথম জীবনে কমিউনিস্ট পরে সিআইএ এজেন্ট ও বলিভিয়ার সরাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও আরগুয়েডেস গোপনে এক সাংবাদিক বন্ধুর মাধ্যমে চে’র বলিভিয়ার ডায়েরির ফটোকপি কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রোর কাছে উপহার হিসেবে পাঠান। হাতে পাওয়ার পরেই কিউবা সরকার চে’র ডায়েরি প্রকাশ করে যার নাম ‘বলিভিয়ার ডায়েরি’। দ্রুত এই বই কিউবা থেকে লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ ও সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। আরগুয়েডেস রাসায়নিক উপাদানে সংরক্ষিত চে’র দুই হাত লেখক বন্ধু জর্জ সুয়ারেজের হাতে তুলে দেন চে’র মৃত্যুর আট দিন পরে। কিন্তু নানা ঘটনায় এগুলো কিউবায় পৌঁছাতে দুই বছরের বেশি সময় লাগে। ১৯৭০ সালের জানুয়ারি তা কিউবায় পৌঁছায়। এদিকে ১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে কিউবা ও আর্জেন্টিনার ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ভ্যালেগ্রান্দেতে হাতবিহীন চে ও তাঁর সঙ্গীদের দেহাবশেষ খুঁজে পান। সেসব দেহাবশেষ কিউবায় পাঠানো হলে কিউবার সান্তা ক্লারায় নতুন স্মৃতিসৌধ স্থাপন করে তাঁকে সমাহিত করা হয়। যা আজ বিপ্লবের পবিত্রতম স্থান বলে বিবেচিত।
অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে সারা বিশ্বে চে এখন অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক, অনেক বেশি জাগ্রত। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে, প্রতিবাদে ও সংগ্রামের রক্তধারায় মিশে আছেন চে। মানুষের জাগরণে অনুপ্রেরণা, প্রণোদনা হয়ে প্রতিদিনের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। শুধু লাতিন আমেরিকা নয়, সারা বিশ্বের নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষের বিপ্লব, বিদ্রোহ ও উত্থানের আরও শক্তিশালী সহযাত্রী হয়ে ফিরে এসেছেন আর্নেস্তো চে গুয়েভারা।


শনিবার, ৫ জুলাই, ২০১৪

 সেইন্ট পিটার্সবার্গ, রাশিয়া

সেইন্ট পিটার্সবার্গ, রাশিয়া




আমাদের এক সহকর্মী গিয়ে উপস্থিত হলেন রাশিয়ায়। তার রাশিয়ান উচ্চারণ থেকে শুরু করে গায়ের রঙ, বেশভূষা দেখে বোঝার উপায়টুকু নেই তিনি রাশিয়ান না-কি অন্যদেশীয়। কিন্তু, সবকিছু উলোটপালোট হয়ে গেল পানীয়ের দোকানে হাসিমুখে সামান্য ভদ্কার অর্ডার করতে গিয়ে। ভদ্কার গ্লাস এগিয়ে দেয়ার সাথে সাথে দোকানী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কোন দেশ থেকে বেড়াতে এসেছো?” তিনি উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “তুমি কি করে বুঝলে আমি অন্যদেশ থেকে এসেছি? কি করে নিশ্চিত হলে আমি রাশিয়ান নয়।” দোকানীর সোজাসাপ্টা উত্তর, “খুব সহজ, রাশিয়ানরা কখনো হাসিমুখে ভদ্কা অর্ডার করে না”।
আহ্! রাশিয়া! মাদার রাশিয়া। কত গল্প, কত মুভ্যি, কত গোয়েন্দাবৃত্তির কাহিনীই না শুনেছি এই দেশটাকে নিয়ে। নীলক্ষেতের রাস্তায় দাঁড়িয়ে কত বইয়ের প্রচ্ছদেই না দেখেছি রাশভারী রাশিয়ান লেখকের ছবি। নিকোলাই গোগলের ‘তারাস বুলবা’ কিংবা টলস্টয়ের ‘ওয়ার এন্ড পিস্’। তার উপর ‘রাদুগা’ প্রকাশনীতো আছেই। শৈশব কৈশরের স্মৃতি হোক আর হলিউডের মুভ্যিতে রাশিয়ান সাবমেরিনের বিধ্বংসী কার্যকলাপের জন্যই হোক, রাশিয়ান শহর সেইন্ট পিটার্সবার্গের পুলকভ বিমানবন্দরে নেমেই সমস্ত দেহ মন রোমাঞ্চে ভরে গেল।
ইমিগ্রেশান লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে দেখলাম খুব দ্রুত কাগজপত্রে সই করে ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে যাত্রীদের। বেশিরভাগ যত্রীই আশপাশের ইউরোপিয় দেশগুলো থেকে এসেছেন। আমারো কম সময় লাগবে এই ভেবে খুশি হয়ে উপস্থিত হলাম অফিসারের সামনে। লেডি অফিসার। আরেকটু যুতসই করে বলি- রাশিয়ান লেডি অফিসার। গুডমর্নিং কিংবা ইভিনিংয়ের কোনো কারবারই নাই। বাজখাই কণ্ঠে সরাসরি বলে, “পাসপোর্ট”। পাসপোর্ট দিলাম। আমার দিকে না তাকিয়েই, টেলিফোনে ডায়াল করতে শুরু করলো। আমার আগের কারো ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি। বুঝলাম ঘটনা খারাপ। তার রাশিয়ান ভাষার এক বিন্দুও বুঝতে পারলাম না, কিন্তু মুখভঙ্গি দেখে আন্দাজ করলাম, সে তার বসকে বলছে, “বদমাইশটাকে হাতে নাতে ধরে ফেলেছি স্যার”। কথা বলছেতো বলছেই, মাঝে মাঝে পাসপোর্ট দেখে কি সব নাম্বার বলছে। শুধু মাঝখান থেকে শুনতে পারলাম, “আমেরিকা”। আমার আর বুঝতে বাকী থাকলো না, বেটি বসকে জানাচ্ছে, “হালায় একটা আমেরিকান স্পাই স্যার, শক্ত কইরা দড়ি দিয়ে বাইন্দা রাখি”। নাহ, যা ভেবছি তা না। কিছুক্ষণ পর ফোন রেখে, কি সব সাইন টাইন করে হেডমাস্টার স্যারদের সমান গম্ভীর মুখ করে বলে, “গো”।
যতই গম্ভীর মুখে বলুক না কেন, সে যাত্রা বেঁচে গেলাম। বিমানবন্দর থেকে বের হতেই দেখি সাদা কাগজে বড় বড় করে Mainul Raju লিখে দাঁড়িয়ে আছে একজন। ইমিগ্রেশান অফিসার যদি হেডমাস্টার হয়, তাহলে এই লোক ডিগ্রি কলেজের প্রিন্সিপাল। দেখেই মনে হয়, ভাবের ভারে কথাই বলতে পারবে না। গিয়ে বললাম, আমি মইনুল রাজু। তারপর, কোনো কথা না বলে সোজা হাঁটা শুরু করলো। আমিও পিছন পিছন হাঁটা শুরু করলাম। হোটেল থেকে গাড়ি নিয়ে এসেছেন। আমাকে অবশ্য আগে থেকেই আমেরিকান বন্ধুরা সতর্ক করে বলেছিলো, “রাশিয়ানরা কিন্তু বেশী কথাবার্তা বলে না”। এয়ারপোর্ট থেকে একটা লোক কয়কে মাইল পাড়ি দিয়ে আমাকে হোটেলে নিয়ে গেলো, একটা কথাও বললো না। আমি বলতে চেষ্টা করেও, দুই একটা ‘হু’ ‘হা’ ছাড়া আর বেশি সুবিধা করতে পারলাম না। বুঝতে পারলাম, ইংলিশ ভালোভাবে পারেন না বলে হয়তো। কিন্তু, আমাদের দেশে যারা ক্যাব চালান, তারাওতো ততটা ইংলিশ বলতে পারার কথা না। তাই বলে তারা কি বিভিন্ন ধরণের মুখভঙ্গি করেন না! তারা কি হাসি দিয়ে অতিথিকে বুঝানোর চেষ্টা করেন না, ইংলিশ না জানার কারণে আমি কিছু বলতে পারছি না, কিন্তু, আমার দেশে তোমাকে অন্তর থেকে স্বাগতম, হে অতিথি। যাই হোক, হোটেলে গিয়ে চাবি বুঝে নিয়ে নিজের রুমে চলে গেলাম।

ছবিঃ দ্যা চার্চ অন স্পিল ব্লাড। যে জায়গাটাতে রাশিয়ান জার আলেকজান্ডার (২) ১৮৮১ সালে গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছিলেন সেই জায়গাটাতে এই চার্চটি নির্মাণ করা হয়।

ছবিঃ সেইন্ট নিকোলাস চার্চ সেইন্ট পিটার্সাবার্গ

ছবিঃ নেভা নদীর তোর ঘেঁষে গড়ে উঠা শহর সেইন্ট পিটার্সাবার্গ

ছবিঃ নেভা নদীর তোর ঘেঁষে গড়ে উঠা শহর সেইন্ট পিটার্সাবার্গ

ছবিঃ নেভা নদীর তোর ঘেঁষে গড়ে উঠা শহর সেইন্ট পিটার্সাবার্গ

ছবিঃ শহরের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া ক্যনাল

ছবিঃ সেইন্ট আইজ্যাক ক্যাথেড্রাল
কিছুটা বিশ্রাম সেরে বিকেল বেলা বের হলাম শহর দেখতে। প্রথম পদচিহ্ন রাখলাম সেইন্ট পিটার্সবার্গের রাস্তায়। রাস্তায় নেমে বুঝতে পারলাম, একি! এ কি দেখছি আমি! শহরের প্রতিটা গলিতে গলিতে আনন্দ। কি অনায়াসে হেসেখেলে একে অপরের কাঁধে হাত রেখে হেঁটে চলছে কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আপন মনে রঙ-তুলিতে ছবি আঁকছেন শিল্পী। গিটার নিয়ে কেউ মনের সুখে বাজিয়ে যাচ্ছে গান। একেবারেই হাসিখুশিতে ভরপুর জমজমাট একটা শহর। তাহলে, কি শুনে এসেছি এতদিন! একজন দুজনকে দিয়ে কখনোই একটা শহরকে কিংবা একটা জাতিকে বিচার করা যায় না। রাশিয়ার সব মানুষই কেজিবির এজেন্ট নয়; সবাই বাসার ছাদে নিউক্লিয়ার বোম্ব সেট করে আমেরিকার দিকে তাক করে বসে নেই। এখানেও শিল্পী আছে, গায়ক আছে, উচ্ছ্বল টিনেজার তরুণ-তরুণী আছে; আমার মত, আমাদের মত, সুখে উদ্বেলিত, দুঃখে জর্জরিত হাজার হাজার সাধারণ মানুষ আছে।








বুঝতে পারলাম, শুধু পূর্ব একটা ধারণা মনের ভেতর আঁকড়ে রাখার কারণে ইমিগ্রেশান অফিসার কিংবা ড্রাইভারের আচরণ আমার কাছে গুরুগম্ভীর মনে হয়েছিলো। আসলে অন্য সব জায়গাতেও একই জিনিস হয়। পার্থক্য শুধু একটা “গুড মর্নিং” কিংবা “গুড ইভনিং” বলার। কি জানি, রাশিয়ান ভাষায় তারা হয়তো কোনো সম্ভাষণ করেছেও, আমিই হয়তো বুঝতে পারিনি। কি জানি, হয়তো আমাদের আমেরিকান বন্ধু ভদ্কার দোকানে গিয়ে অস্বাভাবিক হাসি দেয়ার কারণেই দোকানী বুঝেছিলো, সে রাশিয়ার কেউ নয়। অন্য কারো কথা জানি না, বছরের পর বছর ধরে হলিউডের সিনেমা আমার মনের মানসপটে যে রাশিয়ার ছবি এঁকে দিয়েছে, এই রাশিয়া সেই রাশিয়া নয়। এই রাশিয়া নাচে-গানে-আনন্দে মাতোয়ারা, উৎফুল্ল এক প্রফুল্ল রাশিয়া। তবে একটা কথা বলে রাখা ভালো, মস্কোর পর রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এই সেইন্ট পিটার্সবার্গ শহর একটু অন্য ধরণের। রাশিয়ায় পশ্চিমা সংস্কৃতির সবচেয়ে বেশি প্রসার দেখা যায় এই পিটার্সবার্গ শহরেই। যতটুকু জানি, মস্কো কিংবা অন্য ছোট শহরের রূপ কিছুটা আলাদা।



এমন এক শহর, এমন এক জাতি, যাদের বর্ণমালার একটা বর্ণও আমার চেনা নেই, যাদের ভাষার এক বিন্দু-বিসর্গ বোঝার ক্ষমতাও আমার নেই, সেখানে কেমন করে আমি চলবো ফিরবো, সেটা নিয়েই ভাবছিলাম। কিন্তু, সমাধানটা হয়ে গেলো খুব সহজে। কপালগুণে ব্লগিংটা শুরু করেছিলাম। শহরে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেইন্ট পিটার্সবার্গ শহরে নিজের সগৌরব উপস্থিতির কথা জানান দিলো সহব্লগার তাওসীফ হামীম; মীম নামেই সুপরিচিত। আগে কোনোদিন দেখা হয়নি, কথা হয়নি, তবু দেখা হবার পর মনে হলো আমরা যেন সাত জনমের পরিচিত। দেরী না করে ফেইসবুকে ছবি উঠিয়ে দেয় মীম। সেটা দেখে একজন আবার কমেন্ট করলো- “ দুইটা দামড়া ছেলে খাটে মুখামুখি বসে আছে! ছি ছি ছি”। মীম যে রকম বাংলা বলে, রাশিয়ান তার থেকে কোনো অংশে কম বলে না। তার কল্যাণে যতদূর সম্ভব শহরের সব তথ্য জানাতো হলোই, সাথে সাথে সে স্টুডেন্ট হবার বদৌলতে বহু মিউজিয়াম কিংবা দর্শনীয় স্থানে নামমাত্র মূল্যে মিলে গেল টিকিট। ওদিকে, কোন কোন রাশিয়ান খাবার না খেয়ে ফিরে যাওয়া উচিত হবে না, তার তালিকাটাও পাওয়া গেল তার কাছ থেকেই। শহর থেকে ফিরে আসার আগ দিন পর্যন্ত, যে পরিমাণ আন্তরিকতা একজন সহব্লগার এর কাছ থেকে পেয়েছি, সেটা কখনো ভুলবার নয়।






গোটা সেইন্ট পিটার্সবার্গ শহরে ঘুরে বেড়ালে দেখা যায়, প্রাসাদের ছড়াছড়ি। মানুষের পরিশ্রমকে পুঁজি করে গড়ে তোলা এইসব বৃহদাকার আর সুরম্য প্রাসাদ দেখলেই বুঝা যায়, একদা কত নির্যাতন, দুঃশাসন আর অনাচারের বদৌলতে নির্মিত হয়েছে এইসব অট্টালিকা, কি নির্মমভাবেই না করা হয়েছে সম্পদের যথেচ্ছ অপব্যবহার।

ছবিঃ হেরমিটেজ মিউজিয়ামের ভিতর থেকে তোলা, ১৭৬৪ সালে নির্মিত হওয়া হেরমিটেজ মিউজিয়াম বিশ্বের সবচেয়ে পুরাতন ও বড় মিউজয়ামগুলোর মধ্যে একটি।

ছবিঃ হেরমিটেজ মিউজিয়ামের বাইরে থেকে তোলা।

ছবিঃ সেইন্ট পিটার্সবার্গ শহরের একমাত্র মসজিদ।
প্রাসাদ আছে, অথচ প্রাসাদ ষড়যন্ত্র থাকবে না, তা কি করে হয়। তাই প্রতিটা প্রাসাদের ঘটনা পরিক্রমায় যুক্ত হয়ে আছে কাকে কিভাবে ষড়যন্ত্র করে কখন হত্যা করা হয়েছে সেই ইতিহাস। কিন্তু, সাধারণ মানুষ চিরকাল ধরে প্রাসাদের বাইরের মানুষ, হয়তো তাই তারা সহজে ভুলে যেতে পারে মর্মান্তিক আর নিকৃষ্ট সব প্রাসাদীয় রাজনীতি। আর, সেই বিস্মৃতির পথে ধরে এগিয়ে চলেই সেইন্ট পিটার্সবার্গ শহরের গলিতে গলিতে এখন বিউগলের করুণ সুর নয়, বেজে চলে রোমাঞ্চের রঙিন বাদ্য।
ছবিঃ রোমান্সের শহরে স্বাগতম।


ছবিঃ নিশ্চয়ই রাশিয়ান কুতকুত খেলা।

ছবিঃ মাত্রিওসকা পুতুল, একান্তই রাশিয়ান এই পুতুল।
খুব অল্প কিছু বাংলাদেশী মানুষ আছেন এই শহরে। তাদের একটা সংগঠনও আছে। মীমের কল্যাণে আমার শহরে আসার কথা জানতে পেরেছেন তারা। ঠিকই সংগঠনের প্রেসিডেন্ট একবেলা খাওয়ার জন্য ফোন করে অনুরোধ করলেন। সময়ের অভাবে সেটা সম্ভব হয়নি। কিন্তু, কৃতজ্ঞতা উনার প্রতি, উনাদের প্রতি। কারণ, যত যাই বলি না কেন, ভিনদেশে এই সামান্য বাঙালিপণাটুকু ভালো লাগে। এই জিনিসগুলো আরো বেশি করে স্মরণ করিয়ে দেয় শিকড়ের কথা, আমার যে নিজের একটা দেশ আছে সেই কথা।

ছবিঃ মেট্রো রেইলে চড়ার টানেল।
গোটা শহরে একজন সামান্যতম পরিচিত রাশিয়ানও আমার ছিলো না। ছোটোবেলায় শেখা বাল্যশিক্ষার মত করে রাশিয়ান বর্ণমালা পড়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু, তাই বলে রাশিয়ান ভাষা বলার বিন্দুমাত্র সাহসটুকু ভুলেও কখনো করিনি। সেইন্ট পিটার্সবার্গের ভুগর্ভস্থ ট্রেইন এত বেশি মাটির নীচে যে, স্বয়ংক্রিয় সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতেই বেশ কয়েক মিনিট লেগে যায়। সত্যি বলতে, সেই টানেলের পথ ধরে নামতে নামতে, চলতি পথে অপরিচিত কারো সাথে পরিচয় পর্ব শেষে, ঢং করে খানিকক্ষণ কথা বলার সুযোগটুকুও মিলে যায়। সেই সুবাদে দেখা হয়েছিলো রাশিয়ান এক তরুণীর সাথে। পরের দিন দেখি সে একই তরুণী, রাস্তায় দেখে খানিকটা চিৎকার করেই এগিয়ে আসলো। নিজের অজান্তেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলো “প্রিভিয়েত”। রাশিয়ায় “প্রিভিয়েত” মানে হলো “হাই” বা “হ্যালো”। কখন যে সে সম্বোধনটুকু শিখে ফেলেছি, সেটা নিজেই টের পাইনি। আসলেই, মনের ভাব প্রকাশের জন্যই তো ভাষা; সেই ভাব প্রকাশের প্রয়োজন পড়লে ভাষা আপনা থেকেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে, সেটাইতো সমস্ত ভাষার ইতিহাস।