কালের বিবর্তনে কতো কিছু পাল্টায়—পাল্টায় সংস্কৃতি, সভ্যতা সেই সঙ্গে
পাল্টে যায় মানুষের জীবনধারা। এ পরিবর্তনের রেশ ধরেই হারিয়ে যায় সংস্কৃতির
সুপরিচিত অনেক পুরনো ঐতিহ্য। এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের মধ্যে পালকি অন্যতম।
‘পালকি চলে, পালকি চলে, গগনতলে আগুন জ্বলে’... তাছাড়া আরো সুন্দর ছন্দবদ্ধ
কথা' তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে ...।’ পালকি আমাদের দেশের জাতি, ধর্ম,
বর্ণ সবার কাছে সমান পছন্দনীয় ছিলো। এটি আমাদের দেশের হাজার বছরের পুরনো
ঐতিহ্য। পালকি নিয়ে লেখা হয়েছে গান, ছড়াসহ কতো শত কবিতা। ছন্দের জাদুকর
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেক কবি পালকি নিয়ে
লিখেছেন।
এক কালে এদেশের জমিদার-নবাবসহ সমাজের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা কোথাও যাতায়াত
করলে পালকি ছাড়া চলতোই না যেন। তাদের সামান্য পথটুকু চলতেও পালকি লাগতো।
যেমন—তাদের খাসমহল থেকে ঘোড়ার পিঠ পর্যন্ত বা পানসি ঘাট পর্যন্ত যেতেও
পালকি ব্যবহার করা হতো। এ তো গেলো এক শ্রেণীর লোকদের কথা। এরা ছাড়াও সমাজের
জ্ঞানী-গুণী মানুষদের বরণ করতে তত্কালে পালকির বিকল্প যেন পালকিই ছিলো। সে
আমলে বিদেশি কোনো মেহমান এলেও তাকে পালকিতে চড়িয়ে বরণ করা হতো। যেমনটা করা
হয় বর্তমান দিনে অতিথিদের সম্মানে মোটর শোভাযাত্রায়। সে যা হোক, পালকির
কথা সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তার এদেশে
আসা ভ্রমণ কাহিনীতে। তার লেখার মধ্যে এ কথাও পাওয়া যায় যে, তিনি পালকি
বহনের দৃশ্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
তখনকার দিনের বিয়ে এবং পালকি এ যেন ছিলো একই সুতোয় গাঁথা। আমাদের দেশে এমন
এক সময় গেছে যখন বিয়ের অনুষ্ঠান পালকি ছাড়া হতোই না, পালকি ছাড়া বিয়ে
অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলে যেন নিজেদের হতভাগা বলে মনে করা হতো। নতুন বউ তুলে
দেয়া হতো বরের বাড়িতে পালকিতে করে। আবার এ বিয়ে উপলক্ষে পালকি সাজানো হতো
মনোলোভা ও দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্যে। সব পরিবারে আবার পালকি ছিলো না। তখনকার
দিনে বিত্তশালী ও উচ্চবংশীয় লোকদের প্রত্যেকের বাড়িতে পালকি ছিল বংশের
মর্যাদার প্রতীক। সাধারণ পরিবারের লোকদের বাড়িতে পালকি ছিল না বললেই চলে।
তাই বলে তাদের উত্সব পার্বণ পালকি ছাড়া হতো তা কিন্তু নয়। তাদের জন্য অন্য
ব্যবস্থা ছিলো। সে সময়ে কিছু কিছু মানুষ এ পালকি নিয়ে বাণিজ্য করতো, মানে
পালকি বানিয়ে অর্থের বিনিময়ে চুক্তিতে দিতো। এ জন্য পালকি মালিকদের দিতে
হতো মোটা অংকের কড়ি বা টাকা অথবা তার সমতুল্য অন্য কোনো জিনিস।
পালকিকে ঘিরে আরো কিছু লোক জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতো। এ লোকদের বলা হতো
‘কাহার’ বা ‘বেহারা’। যেদিন তাদের দরকার হতো তার আগে ‘বায়না’স্বরূপ মাইনে
দিতে হতো। বিয়ের অনুষ্ঠানের দিন বিয়ে বাড়িতে তাদের খাওয়ানো হতো জামাই আদরে।
এছাড়া তাদের সম্মানী দিতে হতো বরপক্ষ থেকে।
মেয়ে বাবার বাড়িতে নাইওর যেতেও ব্যবহার করতো পালকি। পালকিতে চারজন বেহারা
বা কাহার প্রয়োজন হতো। গ্রামগঞ্জে অন্যান্য লোকালয়ে পালকিতে করে বউ নেয়া,
দৃশ্য চোখে পড়তো। পালকির দরজার ফাঁক দিয়ে নতুন বউটি বাইরে দৃষ্টি দিতো
কান্না ভেজা চোখে। যখন বেহারারা বউ নিয়ে যেত গ্রাম থেকে গ্রাম পেছনে ফেলে,
তখন তাদের কণ্ঠে চলতো পালকি বহনের গান—‘হুন হুনা হুন হুনরে’ বা ‘চার
বেহারার পালকি চড়ে যায় রে কন্যা পরের ঘরে।’ আরো এরকম হৃদয় ছোঁয়া গানে
গ্রামগঞ্জ যেন জেগে উঠতো নতুন প্রাণে। তাদের পালকি বহনের সময় পা ফেলার
আলাদা তাল বা ছন্দ ছিলো। সেই ছন্দ আর তালের সঙ্গে নিজস্ব গানে গানে কাঁধে
নিয়ে বইতো পালকি।
এখন আর আমাদের গ্রামগঞ্জ, শহর, বন্দরে দেখা যায় না পালকি বহনের দৃশ্য।
পালকি এখন স্থান পেয়েছে জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য। পালকির সেই ঐতিহ্যময়
ব্যবহার ক্রমে গ্রাস করেছে যান্ত্রিক সভ্যতার বিদেশি নানান রংয়ের বাহারি
গাড়ি। পালকি বহনের দৃশ্য এখন যেন স্বপ্ন। সেই সঙ্গে হারিয়ে গেছে ছন্দমাখা
পালকি বহনের গান।
শেয়ার করুন
.jpg)


0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন